জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এর বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা ২০২২ সালের একই সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নেই। তীব্র খরা ও নদ-নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় নৌপথে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি খাত চাপের মুখে পড়ছে। ফ্রান্সের লোয়ার নদীর পানিও রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে।
এর পাশাপাশি অর্থনীতি, পানি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। জার্মানিতে চলতি বছরে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৫০০-তে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের চিকিৎসাসেবায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে সংঘাত ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার পেছনে ভূমিকা রাখছে। খাদ্য ও পানির সংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং মানুষের জীবিকা হারানোর ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন বাড়তে পারে। সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের বড় ধরনের অভিবাসন বিভিন্ন দেশে সামাজিক বিভেদ ও বিদেশিবিরোধী মনোভাব উসকে দিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অনেকগুলোই আবার সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় জর্জরিত। ইয়েমেন ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলো জলবায়ু দুর্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থায়নের ঘাটতিও বড় সমস্যা। ২০২৪ সালে ধনী দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়নে ১৩৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দিলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় তা অনেক কম। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজনে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা দুর্বল হলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে। আর অস্থিতিশীলতা বাড়লে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মোকাবিলার সক্ষমতাও কমে যায়।
এ পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শহর ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


