মানিকগঞ্জ জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে সপ্তাহের শুরুতেই নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকের অপেক্ষায় শ্রেণিকক্ষে বসে থাকতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে, কলেজের শিক্ষক পরিষদের আয়োজনে কক্সবাজারে চার দিনের আনন্দভ্রমণে গিয়ে শিক্ষকদের ‘ও বন্ধু লাল গোলাপী’ গানের তালে আনন্দ-উল্লাসের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়ে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন এবং কলেজের স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) সরেজমিনে কলেজের পাঁচ তলা ভবনের ২৪০২ নম্বর কক্ষে আইসিটি ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট পরও কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হননি।

পরে এক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এসে শিক্ষার্থীদের জানান, অন্য কক্ষে তাঁদের ক্লাস চলছে। তবে শিক্ষার্থীরা জানান, ওই ক্লাস ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এরপর ওই শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করেন। প্রায় ৩৫ মিনিট পর আরেক শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হন।
দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে ওই শিক্ষক বলেন, আসলে ক্লাসটি এখন আমার নেওয়ার কথা ছিল না। তবে এই শিক্ষক ছুটিতে থাকায় আমাকে আসতে হলো।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ১২২ জন। গত ৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাতে শিক্ষক পরিষদের আয়োজনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চার দিনের ভ্রমণে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। রোববার কলেজের নিয়মিত কার্যক্রম চললেও ভ্রমণে অংশ নেওয়া শিক্ষকেরা কলেজে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে।
এদিকে, রোববার কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক মোঃ আজিম মিয়ার ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত দুটি লাইভ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে শিক্ষকদের ‘ও বন্ধু লাল গোলাপী’ গানের তালে আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা যায়। ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষকদের আনন্দভ্রমণ এবং কলেজের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, একাধিক শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় অন্য শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে তাঁদের বেগ পেতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, আমি প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকলে আজ ক্লাসগুলো বন্ধ রাখতে হতো। এভাবে অন্যদের দিয়ে ক্লাস চালিয়ে নেওয়া কঠিন। এর মধ্যে দুপুর ১টা থেকে বোর্ডের পরীক্ষাও রয়েছে।

এ ছাড়া অনার্স ও ডিগ্রি প্রথম বর্ষের কয়েকটি পরীক্ষাকক্ষে নির্ধারিত সময়ের মাত্র পাঁচ মিনিট আগে শিক্ষকদের প্রবেশ করতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় পাঠদান ও পরীক্ষা পরিচালনার সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কলেজে রোববার কতজন শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন ছুটিতে ছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য জানতে প্রশাসনিক শাখায় যোগাযোগ করা হয়। তবে কলেজের প্রধান সহকারী মোঃ আক্কাস আলী এ বিষয়ে তথ্য দিতে রাজি হননি। তিনি উপাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরে কলেজের উপাধ্যক্ষ এস এম সিরাজুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নতুন এসেছি। তাই সবাইকে চিনি না। স্যার আজ ছুটিতে থাকায় আমার কাছে সব তথ্য নেই। কলেজের অধ্যক্ষ পরদিন আসবেন জানিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, আনন্দভ্রমণের দরকার আছে। তবে তাদের এই ভ্রমণের জন্য যদি শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে থাকে, তবে সেটি ঠিক নয়। তারা হয়তো তাদের দায়িত্ব অন্যদের দিয়ে গেছেন। কিন্তু তারা হয়তো তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারেননি, এটা তাদের ব্যর্থতা। তবুও আমি মনে করি, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যার যতটুকু দায়িত্ব, ততটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার।
অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে বক্তব্য জানতে সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহফিল খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি এসে আগামীকাল কথা বলবো বলে ফোন কেটে দেন তিনি।





