জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ক্রমেই প্রকৃতি ও পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জলবায়ুর এই পরিবর্তন কোটি কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নাসরিন সুলতানা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এখন স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত গরম, বায়ুদূষণ, নিরাপদ পানির সংকট এবং রোগবাহিত জীবাণুর বিস্তার মানুষের স্বাস্থ্যকে নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।” তিনি মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতকে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহে শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। রাজধানীর রিকশাচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, “দুপুরে রাস্তায় বের হলে মাথা ঘুরে যায়। কাজ না করলে সংসার চলে না, আবার গরমও সহ্য করা কঠিন।”
এদিকে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য মশাবাহিত রোগের বিস্তারও বাড়ছে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাশেদ মাহমুদ জানান, “আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে মশার বিস্তারের সময় ও এলাকা দুটোই বেড়েছে। আগে যেসব অঞ্চলে নির্দিষ্ট সময়ে এসব রোগ দেখা যেত, এখন সেখানে বছরের দীর্ঘ সময় ধরে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকছে।”
বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পর নিরাপদ পানির সংকটও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। সাতক্ষীরার বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “বন্যার পর বিশুদ্ধ পানি পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে। ঘন ঘন দুর্যোগ, জীবিকা হারানোর ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাবিহা করিম বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের সমস্যা বাড়ছে। এই বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।”
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। খরা, অতিবৃষ্টি ও লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। পুষ্টিবিদ ডা. মাহমুদা আক্তার বলেন, “খাদ্যের মূল্য বাড়লে দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রথমে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু ও নারীদের ওপর।”
সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ। খুলনার গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, “এখন প্রায় প্রতিটি মৌসুমেই নতুন কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। কখনো গরমে অসুস্থ হচ্ছি, আবার কখনো মশার উপদ্রবে ভুগছি।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেনের মতে, “জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ বিষয়ে আরও সচেতনতা প্রয়োজন।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে জলবায়ু সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, রোগ নজরদারি জোরদার, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বৃদ্ধি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ুর অস্থিরতায় জনস্বাস্থ্যের এই সংকট ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। সময়মতো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

