বৈশাখ এলেও উৎসবের আমেজ নেই হাওরাঞ্চলে। চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে কান্না আর হতাশার সুর। প্রাকৃতিক বৈরিতায় ভেঙে গেছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। আগাম বন্যায় ডুবে গেছে বোরো ধান, আর সেই সঙ্গে তলিয়ে গেছে সারা বছরের জীবিকার আশা। কৃষকদের চোখে এখন শুধু অন্ধকার—কীভাবে চলবে আগামী এক বছর, সেই দুশ্চিন্তায় হারাম হয়ে গেছে ঘুম।
বিশেষ করে সচ্ছল কৃষক ও গৃহস্থরা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে। তারা না পারছেন সরকারি সহায়তার তালিকায় নাম তুলতে, না পারছেন কারও কাছে হাত পাততে। এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণে যাচ্ছেন কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুল রশিদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
এদিকে সুনামগঞ্জে সুরমাসহ বিভিন্ন নদীর পানি প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে। গুরমার হাওরসহ কয়েকটি স্থানে হাওর রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিতে পড়লেও দ্রুত মেরামত করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, আপাতত বাঁধ নিয়ে বড় কোনো শঙ্কা নেই, তবে অনেক ধান এখনো কাটার বাকি রয়েছে।
সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে ৩৫ হাজার ৯১৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৭৫৫ কোটি টাকা। হাওরে ধান কর্তন হয়েছে ৭৮ শতাংশ, কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে সুনামগঞ্জে ধান কাটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এপ্রিলের শেষ দিক থেকে টানা বৃষ্টি ও রোদ-ছায়ার লড়াইয়ে বিপর্যস্ত কৃষকরা। পাকার আগেই শত শত একর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কাটা ধান শুকানোর সুযোগ না পেয়ে পচে নষ্ট হচ্ছে। হারভেস্টার সংকটের পাশাপাশি শ্রমিকের অভাব এবং অতিরিক্ত মজুরিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাঠে নেমেছেন ধান কাটতে।
হাওরপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, হতাশা আর হাহাকার চারদিকে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জানিগাঁওয়ের কৃষক মোস্তফা মিয়া জানান, তার ১৩ কিয়ার জমির ধান পানিতে কেটে এনে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখলেও তাতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। অনেকেই ভেজা ধান কম দামে বিক্রি করছেন—যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৪৫০ টাকা, সেখানে ফড়িয়ারা কিনছে মাত্র ৬০০-৭০০ টাকায়।
দিরাই, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশাসহ বিভিন্ন হাওর এলাকায় একই চিত্র। কৃষকের ঘরে খাদ্য নেই, চোখে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। কোথাও ৫০ কিয়ার জমির সব ধান পানিতে ভেসে গেছে, কোথাও আবার কাটা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের চার জেলায় এবার জলাবদ্ধতায় ৩৩ হাজার ৯১৩ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১৩ কোটি টাকা।
এ অবস্থায় সরকার আগাম ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু করেছে। সিলেট অঞ্চলের ৪৪টি খাদ্যগুদামের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে ধান ও চাল সংগ্রহ করা হবে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, অনেক কৃষক এখনও সরকার নির্ধারিত দামের বিষয়ে অবগত নন। ফলে বাধ্য হয়ে তারা কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করছেন।
প্রতি বছর এমন দুর্যোগে হাওরবাসীর জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। বারবার ক্ষতির মুখে পড়ে অনেকেই কৃষির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন—যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হয়ে উঠতে পারে বড় হুমকি।
আগাম বন্যায় হাওরে ধানের বিপর্যয়, কৃষকের মুখে অনিশ্চয়তার ছায়া
.বৈশাখে চিরচেনা উত্সবের পরিবর্তে এলাকা জুড়ে কান্নার সুর ..সারা বছর কীভাবে সংসার চলবে, সেই চিন্তায় চোখের ঘুম উধাও
🕙 প্রকাশিত : ৫ মে, ২০২৬ । ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ

