বৃহস্পতিবার

৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীরবতার শাস্তি ও শক্তির রাজনীতি: প্রতিবাদহীনতার সমাজে ন্যায়ের সংকট

🕙 প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ । ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

মানবসমাজে ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা বহু ক্ষেত্রেই কেবল নীতির দ্বারা নয়, বরং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সক্ষমতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। যে যত উচ্চকণ্ঠে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে পারে, অনেক সময় সে-ই অধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে; আর যারা নীরব থাকে, তারা ধীরে ধীরে বঞ্চনার ঝুঁকিতে পড়ে যায়। এই বাস্তবতা কেবল সামাজিক নয়, বরং এক গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।
প্রকৃতির প্রতীকী চিত্র এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। বৃক্ষ নীরবে ছায়া দেয়, ফল দেয়, জীবনধারণের উপাদান জোগায়—তবু তাদের কোনো দাবি নেই। সেই নীরবতাই যেন তাদের দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে অবলা প্রাণীরাও নিজেদের পক্ষে কথা বলতে পারে না বলে প্রায়শই অনিরাপদ অবস্থায় থাকে। এই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার অসম প্রয়োগের একটি প্রতীকী বাস্তবতা।
মানবসমাজে এই চিত্র আরও জটিল আকার ধারণ করে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে প্রান্তিক বা সাংস্কৃতিকভাবে নিঃশব্দ মানুষরা অনেক সময় সেই ‘নীরব বৃক্ষের’ অবস্থানে পড়ে যায়। তাদের ওপর অবিচার চলতে থাকে, কারণ প্রতিবাদ করার সক্ষমতা বা সুযোগ—দুই-ই সীমিত থাকে। ফলে প্রতিবাদের ক্ষমতা এক ধরনের সামাজিক মুদ্রায় পরিণত হয়, যা কারো নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আবার কাউকে অনিরাপত্তার মধ্যে ঠেলে দেয়।
এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে ক্ষমতার স্বাভাবিক ঝোঁক—প্রতিরোধহীন জায়গায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেও এই প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বিষয়টি কেবল ইচ্ছাকৃত নিষ্ঠুরতা নয়; বরং সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা এক ধরনের ধারণার ফলও বটে—যেখানে নীরবতাকে সহনশীলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তবে এর ফলে একটি গভীর নৈতিক সংকট তৈরি হয়। ন্যায়বিচার তখন কেবল উচ্চারিত বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আর অনুচ্চারিত কষ্ট ও বঞ্চনা অদৃশ্য থেকে যায়। সমাজ যদি শুধুই উচ্চকণ্ঠকে গুরুত্ব দেয়, তবে নীরবদের বাস্তবতা আরও অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল প্রতিবাদের আহ্বান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রতিবাদের সংজ্ঞাকেই বিস্তৃত করা। সব মানুষ সরাসরি প্রতিবাদ করতে সক্ষম নয়—তাই সমাজের দায়িত্ব হলো সেই নীরবতার ভাষা বোঝা ও তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তখনই গড়ে উঠবে, যখন নীরব কণ্ঠও শোনা হবে এবং তাদের বঞ্চনাও সমান গুরুত্ব পাবে।
অতএব, প্রতিবাদহীনতার এই বাস্তবতা কেবল দুর্বলতার গল্প নয়, বরং একটি সামাজিক কাঠামোগত প্রশ্ন। যে সমাজে নীরবতা শাস্তিযোগ্য হয়ে ওঠে, সেখানে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ের পূর্ণতা অর্জন করা কঠিন। সভ্যতার পরিপূর্ণতা তখনই সম্ভব, যখন নীরবরাও নিরাপদ থাকবে এবং প্রতিবাদ না করলেও কেউ নির্যাতনের শিকার হবে না।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ