শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি: নিরাপদ পরিবেশ গঠনে কার্যকর উদ্যোগের তাগিদ

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ২৯ জুলাই, ২০২৬ । ৬:২৫ এএম

দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর নতুন করে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র সমাজে গভীর উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।

একটি উন্নয়ন সংস্থার ছয় মাসের মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে অন্তত ৮৬ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে এবং ৩৩৬ জন শিশু যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় মাত্র ছয় মাসেই এসব অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের অধিকাংশের বয়স শূন্য থেকে ছয় বছরের মধ্যে। অন্যদিকে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি সাত থেকে ১২ বছর বয়সী। বাক্, বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরাও এসব অপরাধ থেকে রেহাই পায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধে অভিযুক্তরা তাদের পরিচিত ব্যক্তি। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা, নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা স্থানীয় পরিচিত মানুষের হাতেই শিশু নির্যাতন বা হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফলে পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ, যা একটি শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, পূর্বশত্রুতা এবং বিকৃত মানসিকতার কারণে নিরীহ শিশুরা এসব অপরাধের শিকার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিকে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি গুরুতর লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্বনেতাদের বক্তব্যও শিশু সুরক্ষার গুরুত্বকে তুলে ধরে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, একটি সমাজের চরিত্র তার শিশুদের প্রতি আচরণের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। একইভাবে মহাত্মা গান্ধী মনে করতেন, পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিশুদের দিয়েই সেই যাত্রা শুরু করতে হবে।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশু নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের অধিকার রক্ষা ও নিরাপত্তা জোরদারে একটি জাতীয় শিশু কমিশন গঠন, শিশু আইন-২০১৩-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিশুগৃহ ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া পরিবার, অভিভাবক এবং সমাজের সবাইকে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিশুদের আত্মরক্ষা, নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের চলাফেরা ও মেলামেশার বিষয়ে সতর্ক নজরদারি রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। তাই শিশু সুরক্ষায় সরকার, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ