মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর, মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠতে লড়ছে শিক্ষার্থীরা

ক্ষতিপূরণ ও উন্নত চিকিৎসাসহ চার দাবি শহীদ ও আহতদের পরিবারের, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুই দিনের সংহতি কর্মসূচি

🕙 প্রকাশিত : ২৬ জুলাই, ২০২৬ । ১:০৪ পিএম

উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। গত বছরের ২১ জুলাই সংঘটিত এ দুর্ঘটনায় ৩৫ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং বিমানের একজন পাইলট। আহত হন ১৭৫ জন, যার মধ্যে ৬৩ জন ছিলেন শিক্ষার্থী।

দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে ফিরলেও অধিকাংশই এখনো ভয়াবহ সেই ঘটনার মানসিক অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পরিবারগুলোর ভাষ্য, অনেক শিক্ষার্থী এখনো আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন, বিষণ্নতা ও আচরণগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। বিমানের শব্দ শুনলেই অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, কেউ কেউ রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে, আবার অনেকেই পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার পর শিশুদের মনে গভীর ট্রমা তৈরি হয়েছে। শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আহত শিক্ষার্থীদের পরিবারে এখনো উৎকণ্ঠা

দুর্ঘটনায় আহত ষষ্ঠ শ্রেণির (ইংরেজি ভার্সন) শিক্ষার্থী জাইয়ানা মাহবুবের মা সানজিদা বেলায়েত জানান, তার মেয়ের মানসিক অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, জাইয়ানা প্রায়ই বলে, ‘মরে গেলে ভালো হতো।’ সামান্য বিষয়েও সে রেগে যায়, ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে এবং নিজের পুড়ে যাওয়া হাত নিয়ে হতাশায় ভোগে।

তিনি আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি জানান। পাশাপাশি জানান, দুর্ঘটনার এক বছর পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

চার দফা দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছেন স্বজনরা

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন জানিয়ে চার দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ, আহতদের আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা ও বিশেষ মেডিক্যাল কার্ড, নিহতদের রাষ্ট্রীয় শহীদের মর্যাদা এবং ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা করে উত্তরায় একটি স্মারক মসজিদ নির্মাণ।

ভয় কাটেনি ইউসারও

দুর্ঘটনায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নূরে জান্নাত ইউসার শরীরের ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে সে আবার নিয়মিত ক্লাস করছে। তবে একসময় পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখা ইউসা এখন আকাশে বিমান উড়তে দেখলেই ভয় পায় এবং দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে।

বিভীষিকার সেই দিন

২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুরে ক্লাস চলাকালে বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই আগুন, ধোঁয়া, আর্তনাদ ও আতঙ্কে ছেয়ে যায় পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের অনেকের চোখের সামনেই সহপাঠীরা প্রাণ হারিয়েছিল, যার স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায়।

ট্রমা কাটাতে পুনর্বাসন উদ্যোগ

শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলতে বিভিন্ন সামাজিক ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা এবং ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য গাজীপুরের পুবাইলে বিশেষ ‘মেন্টাল হিলিং’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সেখানে মেডিটেশন, ছবি আঁকা, খেলাধুলা, উন্মুক্ত কাউন্সেলিং এবং নিহত সহপাঠীদের স্মরণে বৃক্ষরোপণের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

স্মরণসভা ও শ্রদ্ধা নিবেদন

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে নিহতদের স্মরণ এবং আহতদের সুস্থতা কামনায় দোয়া ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, শিক্ষার্থীরা হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের স্মরণ করছে এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে।

এ উপলক্ষে দুর্ঘটনাস্থল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সেখানে স্কাউট ও রোভার সদস্যদের গার্ড অব অনার, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, এক মিনিট নীরবতা পালন, দোয়া, স্মৃতিচারণ এবং নিহতদের ছবি ও স্মৃতিকথা প্রদর্শনের আয়োজন রাখা হয়েছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ