ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর এবং দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাবিষয়ক মূল কেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ নানা প্রয়োজনে এ শহরে আসেন। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই নগরী বর্তমানে তীব্র যানজটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে, যা কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নগর জীবনের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মোট ভূমির মাত্র ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে একটি আদর্শ শহরে অন্তত ২৫ শতাংশ ভূমি সড়কের জন্য বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। প্রধান সড়কের স্বল্পতা সত্ত্বেও রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ যানবাহন চলাচল করছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অতিরিক্ত গাড়ির চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ফলে নগরীর গড় যানবাহনের গতিসীমা দাঁড়িয়েছে ঘণ্টায় মাত্র ৭ কিলোমিটারে, যার কারণে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৮০ লাখেরও বেশি কর্মঘণ্টা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যানজট সমাধানের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে কার্যকর ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর। সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিউল ও দিল্লির মতো মেগাসিটিগুলো সুসংগঠিত মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) এবং সমন্বিত টিকিটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের পরিবহন সংকট সফলভাবে মোকাবেলা করেছে। সীমিত আয়তনের শহর ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না।
যদিও বাংলাদেশে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তবে এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। যানজট নিরসনে দ্রুত সময়ের মধ্যে মেট্রোরেলের বাকি লাইনগুলো সম্পন্ন করা, বাস রুট র্যাশনালাইজেশন, ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল, অবৈধ পার্কিং রোধ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং স্কুল ও অফিসের সময়ে বৈচিত্র্য আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
একই সাথে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ ঢাকার পরিচিতি কেবল তার উঁচু ভবনে নয়; বরং একটি সুশৃঙ্খল, দ্রুত ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা নিশ্চিত হতে পারে।


