যেসব পুরুষকে চিকিৎসকরা এতদিন “শুক্রাণুহীন” বলে মনে করতেন, তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর আধুনিক প্রযুক্তি। নতুন এই প্রযুক্তি এমন সূক্ষ্ম শুক্রাণু শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে, যা আগে মানবচোখে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বসবাসরত এক দম্পতি দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হচ্ছিলেন না। পরে চিকিৎসা পরীক্ষায় জানা যায়, স্বামীর শরীরে ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম নামের একটি জিনগত সমস্যা রয়েছে। এ ধরনের সমস্যায় অনেক সময় বীর্যে খুব কম বা একেবারেই কোনো শুক্রাণু পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় অ্যাজোস্পার্মিয়া।
গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১০ শতাংশ বন্ধ্যা পুরুষ এই সমস্যায় ভোগেন। ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোমে আক্রান্ত পুরুষরা অতিরিক্ত একটি এক্স ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মান, যা অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে শনাক্তই হয় না। ফলে তাদের প্রজনন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
‘স্টার’ প্রযুক্তিতে নতুন আশা
এই সমস্যার সমাধানে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা তৈরি করেছেন অত্যাধুনিক “স্টার” (Sperm Tracking and Recovery) সিস্টেম। প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে অ্যাজোস্পার্মিয়ায় আক্রান্ত পুরুষদের শরীরে থাকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম শুক্রাণু শনাক্ত ও সংগ্রহ করতে সক্ষম।
এ প্রযুক্তিতে উন্নত চিত্রায়ন ব্যবস্থা, বিশেষ মাইক্রোচিপ এবং এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়। নমুনার হাজার হাজার ছবি কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য শুক্রাণু শনাক্ত করা হয়। পরে রোবটিক সিস্টেম সেই শুক্রাণু আলাদা করে সংগ্রহ করে।
গবেষকদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়, যেখানে মানুষের পক্ষে এত সূক্ষ্মভাবে শুক্রাণু শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
যেভাবে কাজ করে প্রযুক্তি
নমুনাকে বিশেষ চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয় এবং প্রতিটি অংশ উচ্চক্ষমতার ক্যামেরায় স্ক্যান করা হয়। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যেই শুক্রাণু শনাক্ত করে এবং রোবটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটিকে আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেক বেশি কার্যকরভাবে শুক্রাণু শনাক্ত করতে সক্ষম।
সফল গর্ভধারণে মিলেছে সাফল্য
এই প্রযুক্তির সাহায্যে শনাক্ত করা শুক্রাণু ব্যবহার করে ইতোমধ্যে সফলভাবে একটি গর্ভধারণ সম্ভব হয়েছে। বহু বছরের হতাশা ও মানসিক চাপের পর সংশ্লিষ্ট দম্পতির জীবনে এসেছে নতুন আশার আলো।
গবেষকদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও অনেক নিঃসন্তান দম্পতির জন্য সুখবর বয়ে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নিঃসন্দেহে বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় বড় ধরনের অগ্রগতি। তবে প্রযুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
তাদের মতে, প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

