রবিবার

২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামের বিস্তার কি আমাদের জনস্বাস্থ্যের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?

🕙 প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২৬ । ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহতা শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কঠিন বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৬৭৭ জন মানুষ, আর প্রাণ হারিয়েছে ৬৬৬ জন। মৃতদের অধিকাংশই শিশু। স্বাধীনতার পর দেশে হামের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—যে দেশে বহু বছর ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিকভাবে সফল উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত, সেখানে হামে এত মৃত্যুর কারণ এখনো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেনি, মৃত শিশুদের কতজন টিকা পেয়েছিল, কোন বয়সীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে কিংবা টিকাপ্রাপ্তদের মধ্যেও সংক্রমণের হার কত ছিল। অর্থাৎ সংকটের কেন্দ্রে থেকেও আমরা পূর্ণাঙ্গ তথ্যের বাইরে অবস্থান করছি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘ডেটা ব্লাইন্ডনেস’ বা তথ্যগত অন্ধত্ব হিসেবে বর্ণনা করছেন। কারণ, কার্যকর তথ্য ছাড়া কোনো মহামারি বা সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করা দীর্ঘমেয়াদে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে প্রতিবছর কিছু শিশু থেকে যায়। এই বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা বছর বছর জমতে থাকলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশেও ঠিক এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যার ফল এখন দৃশ্যমান।

তবে টিকাদানের ঘাটতিই একমাত্র কারণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপুষ্টি, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো গভীর সংকট। শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মির্জা জিয়াউল ইসলাম ও ভাইরোলজিস্ট খন্দকার মাহবুবা জামিল আগেই বলেছেন, অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে টিকা নেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে।

গত কয়েক বছরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক চাপে দরিদ্র পরিবারের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। অনেক শিশুই প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে মাতৃপুষ্টি ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, মাতৃদুগ্ধই নবজাতকের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই সুরক্ষা দুর্বল হয়ে গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি হিসাব হয়তো প্রকৃত পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরছে না। কারণ, বহু পরিবার হাসপাতালে যায় না বা ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা নেয়। ফলে বাস্তব আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সরকার ইতোমধ্যে গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার দাবি করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু শুধু টিকাদান করলেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপুষ্টি মোকাবিলা, মাতৃদুগ্ধপান বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন গবেষণা।

হামের এই পরিস্থিতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে—জনস্বাস্থ্য শুধু হাসপাতাল, চিকিৎসক বা ওষুধের বিষয় নয়। এটি পুষ্টি, প্রতিরোধ, তথ্যব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা ও স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত ফল।

৬৬৬ শিশুর মৃত্যু কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক গভীর সতর্কবার্তা। এখনই যদি এই সংকটের মূল কারণ খুঁজে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো সংক্রামক রোগ আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তখন হয়তো আবারও একই প্রশ্ন উঠবে—এই মৃত্যুগুলো কি সত্যিই অনিবার্য ছিল?

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ