শনিবার

১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীরব সংকটে বিশ্ব: মানসিক স্বাস্থ্যের মহামারি মোকাবিলায় এখনই উদ্যোগ জরুরি

🕙 প্রকাশিত : ৯ জুন, ২০২৬ । ৮:৫১ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব আজ প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক বিস্ময়কর সময়ে দাঁড়িয়ে। উন্নয়ন ও আধুনিকতার এই যাত্রায় মানবসভ্যতা যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি নীরবে বেড়ে উঠছে আরেক ভয়াবহ সংকট—মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার এই অদৃশ্য চাপ এখন বিশ্বব্যাপী এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে।

চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। কৈশোর ও যৌবনের সময়টিই একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অথচ এই বয়সেই বাড়ছে মানসিক চাপ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এমনকি সামাজিক আচরণেও। আত্মবিশ্বাসের অভাব, সিদ্ধান্তহীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদকাসক্তি কিংবা আত্মহানির প্রবণতাও বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বিশ্বজুড়ে এত দ্রুত বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারি এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতা।

বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ধ্বংস, মৃত্যু ও মানবিক বিপর্যয়ের ছবি মানুষের মনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিশু ও তরুণদের কোমল মনোজগতে ভয়, উদ্বেগ ও হতাশা স্থায়ী ছাপ রেখে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক বিকাশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তবে আশার বিষয় হলো, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইতোমধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করতেও চালানো হচ্ছে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমাদের দেশে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যকে অনেকাংশে অবহেলার চোখে দেখা হয়। অথচ একটি জাতির উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; মানুষের মানসিক সুস্থতাও এর অন্যতম ভিত্তি।

আজকের তরুণ সমাজ যদি উদ্বেগ ও হতাশার ভারে ভেঙে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ ও রাষ্ট্রও তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে আর ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশ্ব যখন এক নীরব মানসিক স্বাস্থ্য মহামারির মুখোমুখি, তখন নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও মানসিকভাবে সুস্থ সমাজ গঠনে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ