বুধবার

৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাছের পৃথিবী সংকুচিত হলে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎও হুমকিতে পড়ে

🕙 প্রকাশিত : ২ জুন, ২০২৬ । ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে পৃথিবীর কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। সভ্যতা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে যেন মানুষই। কিন্তু প্রকৃতির বাস্তবতায় মানুষ একক কোনো শক্তি নয়; বরং সে বৃহত্তর জীবজগতের একটি অংশমাত্র। মানুষের অস্তিত্ব, উন্নয়ন ও টিকে থাকা বহু আগ থেকেই নির্ভর করে এসেছে উদ্ভিদজগতের ওপর। খাদ্য, অক্সিজেন, ওষুধ, আশ্রয় কিংবা শিল্পকারখানার কাঁচামাল—প্রায় সবকিছুর শিকড়ই গাছপালার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই উদ্ভিদের পৃথিবী ছোট হয়ে এলে মানুষের পৃথিবীও যে সংকুচিত হবে, তা অনিবার্য।

সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা নতুন করে সেই আশঙ্কাই সামনে এনেছে। গবেষণায় ৬৭ হাজারের বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ৭ থেকে ১৬ শতাংশ উদ্ভিদ তাদের বর্তমান আবাসস্থলের ৯০ শতাংশের বেশি হারাতে পারে। এর ফলে বহু প্রজাতি বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে পড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে আমরা সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধির সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি আরও গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট। বৃষ্টিপাতের ধরন, মাটির গুণাগুণ, আর্দ্রতা, বনভূমির ভারসাম্য, এমনকি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে। একটি উদ্ভিদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে বহু সূক্ষ্ম পরিবেশগত উপাদানের সমন্বয়ের ওপর। সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে উদ্ভিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

মানুষ প্রয়োজন হলে নতুন জায়গায় চলে যেতে পারে, কিন্তু উদ্ভিদ তা পারে না। তাদের বিস্তার ঘটে ধীরগতিতে—বীজ, রেণু, বাতাস, পানি কিংবা প্রাণীর মাধ্যমে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে বহু উদ্ভিদ নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর আগেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।

এই সংকট কেবল গাছপালার নয়; পুরো পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের। কারণ বনভূমি ও উদ্ভিদরাজি বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। উদ্ভিদের বৈচিত্র্য কমে গেলে কার্বনচক্র ব্যাহত হবে, ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়বে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন যেমন উদ্ভিদ ধ্বংস করছে, তেমনি উদ্ভিদ ধ্বংসও জলবায়ু সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহের প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। এর সঙ্গে বনজ সম্পদ ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের সংকট যুক্ত হলে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য আরও বড় হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে নতুন উদ্ভিদ প্রজাতির বিস্তার ঘটতে পারে। কিন্তু তা সামগ্রিক ক্ষতি পূরণে যথেষ্ট নয়। কারণ নতুন উদ্ভিদসমাজ তৈরি হওয়া মানেই পুরোনো পরিবেশগত ভারসাম্যের ভাঙন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ বহুবার প্রকৃতিকে জয় করার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে পারে না। গাছপালার পৃথিবী সংকুচিত হওয়া মানে মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্য ও অস্তিত্বের পরিধিও সংকুচিত হওয়া। তাই উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা কোনো আবেগের বিষয় নয়; এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্ন।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ