অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। দলের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক নাছরুল্লাহ হোসাইন, উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন এবং উপসহকারী পরিচালক রোমান উদ্দিন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত নথিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ফাইল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য ও রেকর্ডপত্র পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দুদকের চিঠিতে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি করা হয়েছে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৭ মে ও ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিলের দুটি স্মারকের মাধ্যমে বদলিসংক্রান্ত নথির সত্যায়িত ছায়ালিপি চাওয়া হয়েছে। তিনটি স্মারকের আওতায় ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব প্রদান, বাতিল ও পদায়নসংক্রান্ত নথির সত্যায়িত ছায়ালিপিও চেয়েছে কমিশন।
একই চিঠিতে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত ছায়ালিপি চাওয়া হয়েছে। তালিকায় ঢাকার গোলাম মোস্তফা, মামুন, জাহিদ ও আমির; বগুড়ার আনিচ, জাহিদ ও ইব্রাহীম; বরিশালের জুলহাস; পাবনার নকিমউদ্দিন, আলী হোসেন ও আবু সাঈদ; ধামরাইয়ের কোরবান আলী এবং নরসিংদীর আলী হোসেনের নাম রয়েছে।
এসব কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফাইলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও সহায়ক রেকর্ডপত্রও অনুসন্ধান দলের কাছে জমা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
পদায়ন ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের স্থানে পদায়ন ও পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার নামে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার ও কেনাকাটায় একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
আসিফ মাহমুদের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নসহ বিভিন্ন অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৩৮ কর্মকর্তার পদায়নে ৭৬ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন করে পদায়নের আদেশের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি কর্মকর্তার কাছ থেকে গড়ে প্রায় দুই লাখ টাকা করে নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পদোন্নতির জন্য মোট এক কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য আরও দুই কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
সব মিলিয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত এসব অভিযোগে অর্থ লেনদেনের পরিমাণ চার কোটি ২৬ লাখ টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
টেন্ডার ও কেনাকাটায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ
কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির পাশাপাশি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কার্যক্রমে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধ বিটকয়েন লেনদেন, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মতো অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রীড়া উপদেষ্টা থাকাকালে ক্রিকেট বোর্ডের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগে তার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

