ভবিষ্যতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমাতে সহনশীল নগর পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধার এবং পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর প্রস্তুতির মাধ্যমে বাংলাদেশ মৌসুমি বন্যা ও বর্ষাকালের চ্যালেঞ্জ আরও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পানি সম্পদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, উন্নত পরিকল্পনা, কার্যকর নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং স্থানীয় জনগণের প্রস্তুতি জোরদার করা গেলে দেশের দুর্যোগ-সহনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, আষাঢ় মাসে ভারী বৃষ্টিপাত বাংলাদেশের মৌসুমি জলবায়ুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য এবং এটি কৃষি ও পানি সম্পদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষায়, “এ সময়ই তো বৃষ্টি হওয়ার কথা। এখন যদি বৃষ্টি না হয়, তাহলে কখন হবে?”
তবে সমস্যার মূল কারণ বৃষ্টিপাত নয়; বরং বৃষ্টির পানি যেন খাল, জলাভূমি ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বহু প্রাকৃতিক খাল ও পানি নিষ্কাশনের পথ বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি অনেক সড়ক, বাঁধ ও অবকাঠামো পর্যাপ্ত পানি চলাচলের ব্যবস্থা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে।
খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতের অবকাঠামো প্রকল্পে কার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে মত দেন তিনি।
অধ্যাপক নিশাত আরও বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ভূ-প্রকৃতি ও কৃষি ব্যবস্থা একসময় মৌসুমি বন্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পুকুর, জলাভূমি এবং দেশীয় ধানের জাত বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ধীরে ধীরে তা নিষ্কাশনে সহায়তা করত। আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থার পাশাপাশি এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করলে দেশের জলবায়ু সহনশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে বৃষ্টিপাতের ধরনে অনিশ্চয়তা ও বৈচিত্র্য আরও বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, উন্নত নগর পরিকল্পনা এবং প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধারের গুরুত্বও বাড়বে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল ত্রাণ বিতরণের ওপর নির্ভর না করে উন্নত অবকাঠামো, প্রস্তুতি এবং অভিযোজনভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে হবে।
অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে নদীবন্যা, আকস্মিক বন্যা এবং নগর বন্যাসহ বিভিন্ন ধরনের বন্যা দেখা যায় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদা ধরনের ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
তার মতে, চলমান ভারী বর্ষণের পেছনে একটি মৌসুমি নিম্নচাপ কাজ করেছে, যা বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা দেশের পূর্বাঞ্চলে নিয়ে আসে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সেখানে বৃষ্টিপাতের তীব্রতাও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, অস্বাভাবিক এই বর্ষণে কিছু এলাকায় নদী ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই অতিক্রম করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডল আরও বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে সক্ষম হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত নগরায়ণের ফলে জলাভূমি, খাল ও উন্মুক্ত স্থান কমে গেছে, যা একসময় বৃষ্টির পানি ধারণ করত। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক জলাধার দখলের কারণে নিষ্কাশন ব্যবস্থার স্বাভাবিক সংযোগও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কার্যকরভাবে ভবন নির্মাণবিধি বাস্তবায়ন, পুকুর ও খাল সংরক্ষণ এবং সবুজ এলাকা রক্ষা করা গেলে শহরগুলো আরও দুর্যোগ-সহনশীল হয়ে উঠবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার রাখা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং নগর জলাবদ্ধতাও কমবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা, কার্যকর রাডার প্রযুক্তি এবং সময়োপযোগী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মত দেন এই বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোর উচিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জলাধার সংরক্ষণ, খাল দখল রোধ এবং পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
নদী ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বন্যা প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হবে।
দুই বিশেষজ্ঞই একমত পোষণ করে বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, উন্নত অবকাঠামো এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
এদিকে, সরকারের নির্দেশনায় বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জানমাল রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বলেছেন, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত থাকবে।
তিনি জানান, সার্বিক দুর্যোগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, ৭ জুলাই থেকে দেশের ৬৪ জেলার বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে।


