জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় পরিসরে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রেখেছে সরকার। একইসঙ্গে সাশ্রয়, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বহুমুখী ব্যবস্থাপনা জোরদার করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অ্যাঙ্গোলা থেকে মোট ২০ কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলেই ৯টি কার্গো ক্রয় করা হয়েছে এবং ৬টি ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি কার্গোগুলোও দ্রুত আসার কথা রয়েছে। মে মাসে আরও ১১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানিও অব্যাহত আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি সরকার চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও পদক্ষেপ নিয়েছে। অফিস সময় কমানো, ব্যাংকিং সময়সীমা সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাজার ও শপিংমল খোলা রাখার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এপ্রিল মাসে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বাড়ায় কৃষকদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে সম্প্রতি ১ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেলবাহী তিনটি ট্যাংকার ভিড়েছে। এছাড়া ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে, যার একটি অংশ ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে।
জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া দ্রুত করতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিনে নামানো হয়েছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় গতি এসেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও জোর দিচ্ছে। বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমদানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত রাখার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করে, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই।
অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে সারাদেশে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযানে প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম সরকারের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এসব পদক্ষেপের সুফল ধীরে ধীরে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সব মিলিয়ে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগের ফলে আগামী কয়েক মাস জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। বর্তমানে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে, যা পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়ক হবে।

