বাংলাদেশে নীরবে বিস্তার ঘটছে নতুন ধরনের সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের। এমডিএমএ, এলএসডি, কেটামিন, ফেন্টানাইল, সাইলোসাইবিন ও ডিএমটির মতো উচ্চমূল্যের এসব মাদক মূলত অভিজাত তরুণ সমাজকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে এই নতুন মাদক নেটওয়ার্ক।
ঢাকার বসুন্ধরায় বসবাসকারী ২৭ বছর বয়সী রায়ান (ছদ্মনাম) জানান, ২০২২ সাল থেকে বিভিন্ন পার্টি ও গানের আসরে তিনি এমডিএমএ গ্রহণ করেছেন। প্রথমবার বারিধারার একটি ছাদ পার্টিতে তিনি এই মাদক নেন। তার ভাষায়, “এটা এমনভাবে হাত ঘুরছিল যেন সাধারণ কোনো সিগারেট।”
র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা এ এন এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, বাংলাদেশে এই অভিজাত মাদকের বিস্তার নতুন নয়। তিনি দাবি করেন, কয়েক বছর আগেই ম্যাজিক মাশরুম, আইস, এলএসডি, ফেন্টানাইলসহ নানা মাদকের প্রথম বড় চালান জব্দে অভিযান চালিয়েছিলেন তিনি ও তার দল। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এসব মাদকের তথ্য নথিভুক্ত করার আগেই এগুলো দেশে প্রবেশ করে নিজেদের বাজার তৈরি করেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে অন্তত ১২ ধরনের নতুন মাদক শনাক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথম আইস, এলএসডি ও ডিএমটির সন্ধান মেলে। পরে সাইলোসাইবিন ও এমডিএমএর মতো মাদকও ধরা পড়ে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিস, সীমান্ত চোরাচালান এবং বৈধ ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে এসব মাদক দেশে প্রবেশ করছে। অভিজাত এলাকার ছোট ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় এগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
নেওয়াজের ভাষায়, “এগুলো এখন স্ট্যাটাসের প্রতীক হয়ে গেছে। গুলশান-বনানীর পার্টিতে মলি বা এলএসডি থাকা অনেকের কাছে নিজেকে ‘কুল’ প্রমাণের বিষয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমডিএমএ মস্তিষ্কে সেরোটোনিন, ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে ব্যবহারকারীকে সাময়িক উচ্ছ্বাস, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক স্বস্তি দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি স্মৃতিশক্তি, মানসিক স্থিতি ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
অন্যদিকে এলএসডি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক স্নায়বিক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটিয়ে ভ্রম ও মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি করে। ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় এলএসডির বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। তদন্তে উঠে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গোপন গ্রুপের মাধ্যমে দেশে এই মাদক সরবরাহ করা হচ্ছিল।
২০২৬ সালে উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। ওই ফ্ল্যাটে কেটামিনকে পাউডারে রূপান্তরের একটি অস্থায়ী ল্যাব পাওয়া যায়। সেখান থেকে কেটামিন, ডিজিটাল স্কেল ও প্যাকেজিং সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক মাদক পাচারের নতুন রুট তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া ফেন্টানাইল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। মরফিনের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী এই মাদক যুক্তরাষ্ট্রে হাজারো মৃত্যুর কারণ হলেও বাংলাদেশে এখনো এর ভয়াবহতা প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক সক্ষমতা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব মাদক শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইয়াবা ও কোকেন জব্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও হেরোইন ও ফেনসিডিলের প্রবণতা কমেছে। কর্মকর্তাদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে মাদকের ধরন ও রুট বদলাচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিনথেটিক মাদক মোকাবিলায় বিশেষ ফরেনসিক ল্যাব, সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও অর্থ পাচার তদন্ত ইউনিট গঠনের কাজ চলছে। বিমানবন্দরে উন্নত স্ক্যানার স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন মাদক নেটওয়ার্কের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক বছর সিনথেটিক মাদকই দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্য: the business standard

