কলি বড়াল-এর দ্বিভাষিক কাব্যগ্রন্থ ‘নক্ষত্রদের দেয়াল’ (Luminous Barrier) সমকালীন বাংলা কবিতার ব্যতিক্রমী দলিল। এতে প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতা সমান্তরাল রেখায় মিলেছে। বইটির প্রচ্ছদ কবি নিজেই করেছেন। নীল পটভূমিতে উজ্জ্বল রঙের তুলির ছোঁয়া ও মানুষের ছায়া অবয়বের সংমিশ্রণে প্রচ্ছদটি নান্দনিক হয়ে উঠেছে। এটি কবির সৃষ্ট আধ্যাত্মিক ও বাস্তব জগতের মেলবন্ধন।
শিল্পী ধ্রুব এষ-কে উৎসর্গ করা বইটিতে ৩০টি কবিতা রয়েছে। প্রতিটি পাতায় আধুনিক মননশীলতার ছাপ স্পষ্ট। শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ বইটিকে অনন্য করে তুলেছে। প্রচ্ছদটি এক অতীন্দ্রিয় জগতের প্রবেশদ্বার বলে মনে হয়। এখানে নীল রঙের ব্যবহার বিশালতা ও গভীরতার প্রতীক।
সুচিপত্রে ‘আঙুল’, ‘আবিষ্কার’ কিংবা ‘ডোপামিন’-এর মতো শিরোনামগুলো পাঠকের মনে কৌতূহল জাগায়। কবি অতি চেনা শব্দে অচেনা এক অনুভূতির জগত খুলে দিয়েছেন। লতিফুল খবির কল্লোল, স্বপন রায় ও কবি নিজের ইংরেজি অনুবাদ মূল কবিতার নির্যাস অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বাংলার সহজ শব্দগুলো ইংরেজিতেও সমান আবেদন তৈরি করেছে। কবির শব্দ চয়ন মেদহীন ও সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে। আধুনিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অল্প কথায় বিশাল ভাব প্রকাশ করা। কলি বড়াল ওই মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন।
বইটির প্রারম্ভিক কবিতা ‘আঙুল’-এ কবি মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তুলেছেন— ‘ওগো সুন্দরতম চাঁদ-/ অমাবস্যা-পূর্ণিমার পাক্ষিক জোয়ার শরীরে নটরাজ।/ অন্তরে বুনেছি চন্দ্রকলার সৌকর্য্য।’
এখানে শরীর ও মহাজাগতিক উপমা মিলেমিশে একাকার। ইংরেজি রূপান্তর ‘The Finger’-ও মূল ভাব বজায় রেখেছে। ‘আবিষ্কার’ কবিতায় বিচ্ছেদের ভয় ছাপিয়ে আত্ম-আবিষ্কারের আনন্দ ফুটে উঠেছে— ‘বিচ্ছেদ-ভয় তোমাকে পেয়ে বসে না/ ভাঙন সুর হৃদয় সমুদ্রে গুলে পাণ্ডুলিপি।/ আমার গান বাজারের ফর্দ।’
কবিতার ইংরেজি রূপান্তর ‘Discovery’-তেও এই গভীরতা ধরা পড়ে— ‘You are not afraid of separation./ Manuscripts melt in the heart brine with breaking notes.’ কবির পঙ্ক্তিতে বিরহ কোনো হাহাকার নয়, এক শক্তির উৎস। তিনি জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে ‘বাজারের ফর্দ’-এর সঙ্গে তুলনা করে কবিতার আঙিনায় নতুন ডিকশন তৈরি করেছেন।
কবি আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষা ব্যবহার করে মনের গহীন রসায়ন ব্যাখ্যা করেছেন। ‘ডোপামিন’ কবিতায় তার অকপট স্বীকারোক্তি— ‘আমি কোন দিন কবিতা লিখিনি, / এ নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণে নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স।’ এই পঙ্ক্তিমালা প্রমাণ করে কবিতা কবির কাছে কৃত্রিম নির্মাণ নয়। এটি স্নায়বিক তাড়না ও তীব্র আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। বিজ্ঞানের সঙ্গে কাব্যের এই মিলন বইটিকে আধুনিক পাঠকদের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। ডোপামিন নিঃসরণের সঙ্গে সৃজনশীলতার এই সম্পর্ক কবিতার জগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কবি নিজেকে কেবল ভাবুক হিসেবে নয়। একজন মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষক হিসেবেও উপস্থাপন করেছেন।
বইটির প্রতিটি পাতায় প্রেম ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা দেয়। কবি প্রকৃতিকে দেখেছেন প্রেমের দর্পণ হিসেবে। নক্ষত্র, চাঁদ, সমুদ্র ও উপকূল তার কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। মানুষের সীমাবদ্ধতা ও অসীমতার লড়াই কবি সুনিপুণভাবে এঁকেছেন। তিনি নক্ষত্রদের দেয়াল বলতে কী বুঝিয়েছেন, তা বুঝতে হলে কবিতার গভীরে ডুব দিতে হবে। এই দেয়াল যেমন আড়াল তৈরি করে, তেমনি আলোর ইশারাও দেয়। প্রেমের সঙ্গে প্রকৃতির এই নিবিড় সম্পর্ক পাঠকদের আদিম এক সত্তার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
বাংলা ও ইংরেজি পাশাপাশি থাকায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই কবিতার আবেদন তৈরি হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থের চেয়ে ভাবের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইংরেজি লাইনের ছন্দের মধ্যে প্রেমিকের আগমনের অপেক্ষা ও তার স্পর্শের ব্যাকুলতা সুন্দরভাবে প্রকাশিত। লতিফুল খবির কল্লোল ও স্বপন রায়ের এই কাজ বইটিকে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় পৌঁছে দেওয়ার যোগ্য করে তুলেছে। কবিতার ভাব অনুবাদ করা কঠিন কাজ হলেও এখানে তা অত্যন্ত সার্থকতা পেয়েছে।
কলি তার সহজ অথচ গভীর শব্দ চয়নের মাধ্যমে পাঠককে নিজের মনের কোণে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো পুনরায় আবিষ্কার করতে সাহায্য করেন। এখানে আধ্যাত্মিকতা কোনো ধর্মীয় আচারের নাম নয়, এটি আত্মার মুক্তি ও সন্ধানের পথ। কবির ভাবনায় জীবন এক বহমান স্রোত, যেখানে বিচ্ছেদ ও মিলন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মহাজাগতিক বিষয়ের সঙ্গে মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আবেগ জড়িয়ে থাকে।
‘নক্ষত্রদের দেয়াল’ কেবল একটি কবিতার বই নয়। এটি অনুভূতির এক নীল আকাশ। কলি তার সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর শব্দ চয়নে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। এটি পড়ার সময় পাঠক নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করেন। শব্দের কারুকাজ ও চিন্তার গভীরতায় বইটি দীর্ঘকাল পাঠকদের হৃদয়ে টিকে থাকবে। কবিতা ও জীবনের এই সন্ধিক্ষণে ‘নক্ষত্রদের দেয়াল’ এক অনিবার্য গন্তব্য। আধুনিক মনস্তত্ত্ব, বিজ্ঞান ও তীব্র অনুভূতির এমন সম্মিলন বাংলা কবিতায় সচরাচর দেখা যায় না। এই কাব্যগ্রন্থটি আগামীর কবিদের জন্য এক নতুন পথনির্দেশিকা হতে পারে। কলি এই সৃজনশীল যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হোক। কবিতামোদীদের জন্য এই গ্রন্থটি সংগ্রহে রাখার মতো একটি সম্পদ।
কলি বড়াল একজন সমকালীন কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রচ্ছদ শিল্পী। ১৯৯৪ সালে বরগুনার পাথরঘাটায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে তিনি শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় যুক্ত আছেন। ২০২৩ সালে তিনি ‘বোয়াও আন্তর্জাতিক কবিতা পুরস্কার’ ও ‘বর্ষসেরা তরুণ কবি’-এর স্বীকৃতি লাভ করেন। কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস ও গল্পসহ তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ছয়টি।
কাব্যগ্রন্থ : নক্ষত্রদের দেয়াল / Luminous Barrier
কবি: কলি বড়াল
অনুবাদ: স্বপন রায় ও লতিফুল কবীর কল্লোল
প্রকাশক: আলী আফজাল খান (একটি ভিন্নচোখ প্রকাশনা)
প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২৬
মূল্য: ৩০০ টাকা


