নেপালের ল্যাংট্যাং লিরাং অঞ্চলে ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় সংঘটিত সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিপর্যয় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির নতুন এক চিত্র সামনে এনেছে। বিশাল একটি পর্বতশিখর ধসে প্রায় ৪ হাজার ফুট নিচে আছড়ে পড়া, এর ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে বরফ, পাথর ও পানির ভয়াবহ স্রোত পুরো অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এ ধরনের ঘটনাকে ‘হিমবাহ সুনামি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার শুরুতে এটিকে সাধারণ ভূমিধস বলে মনে হলেও পরে এর ধ্বংসাত্মক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতার একটি বিশাল শিখর ধসে পড়ার সময় সৃষ্ট কম্পনের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নিচে নেমে আসে। এতে লেন্ডে নদীতে তৈরি হয় অস্থায়ী বাঁধ। পরে পানির চাপে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত সৃষ্টি হয়।
প্রায় ১৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতির এই স্রোত তার পথে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো ধ্বংস করতে করতে এগিয়ে যায়। লেন্ডে নদী থেকে বোতেখি ও ত্রিশুলি নদীর সংযোগস্থলে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে নদীর পানির উচ্চতা তিনতলা ভবনের সমান হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।
গলে যাচ্ছে হিমালয়ের ‘অদৃশ্য সিমেন্ট’
হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে পার্মাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটির স্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একে পাহাড়ের ‘অদৃশ্য সিমেন্ট’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই জমাট স্তর গলতে শুরু করায় পাহাড়ের শিলা ও বরফের মধ্যকার দৃঢ় বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গলিত পানি বরফ ও শিলার ফাটল দিয়ে নিচে প্রবেশ করে এক ধরনের লুব্রিক্যান্টের মতো কাজ করতে পারে। এতে পাহাড়ের ঢাল ও হিমবাহের স্থিতিশীলতা কমে যায় এবং বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ ধরনের বিপর্যয় সাধারণ হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা গ্লেসিয়ার লেক আউটবাস্ট ফ্লাডের চেয়ে আলাদা। হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে একটি হ্রদের বাঁধ ভেঙে পানি নিচে নেমে আসে। কিন্তু ল্যাংট্যাং লিরাংয়ের ঘটনায় কোনো হ্রদ না থাকলেও বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ সরাসরি পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে আছড়ে পড়ে। ফলে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগও অনেক কম থাকে।
ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংস
এই বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত ৬০০ মরদেহ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার নেপালি এবং ৫০০ বিদেশি পর্যটক রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
তিব্বতের গিরং এলাকায় কৈলাস ও মানস সরোবরগামী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গম বহু জনপদ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুতর। দেশটির মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি নেপালের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সীমান্ত পেরিয়ে বাড়ছে ঝুঁকি
হিমালয় থেকে নেমে আসা এই প্রবল স্রোতের প্রভাব নেপাল ও তিব্বতের বাইরে ভারতের নদীগুলোতেও পড়েছে। নারায়ণী ও গ-ক নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকায় জরুরি উচ্ছেদ অভিযান চালাতে হয়েছে।
এ ঘটনায় আঞ্চলিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। নেপাল, ভারত ও চীনের মধ্যে হিমালয়সংক্রান্ত আবহাওয়া, হিমবাহ ও নদীর পানির তথ্য দ্রুত বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
আগের ঘটনাগুলোও ছিল সতর্কবার্তা
হিমালয়ের এই বিপর্যয়কে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০১৬ সালে তিব্বতের রুটোগ রেঞ্জে দ্বৈত হিমবাহ ধস এবং ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ দুর্ঘটনাও হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিবেশগত পরিস্থিতির ঝুঁকি তুলে ধরেছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু ভারী বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রার পরিবর্তনই নয়, পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত হচ্ছে। অথচ প্রচলিত দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা মূলত বৃষ্টিপাত, নদীর পানি ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা ও বরফের স্তরের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের নানা চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি অঞ্চলেও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও সবুজায়নের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এসব পরিবর্তন পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
হিমালয় অঞ্চলে দুই হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ এবং হাজার হাজার হিমবাহ রয়েছে। এত বিশাল এলাকাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হলেও ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে এর কোনো বিকল্প নেই।
স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে হিমবাহ ও পাহাড়ের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, উন্নত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে দ্রুত তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়ার প্রতিটি পরিবর্তন শুধু নেপাল বা তিব্বতের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদীগুলো কোটি কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, পানীয় জল ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তাই হিমালয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই আরও কার্যকর, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।

