জলবায়ুর অস্থিরতায় বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি

শহিদুল ইসলাম সুজনসম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক টেলিগ্রাম
🕙 প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট, ২০২৬ । ৬:৫১ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, উচ্চ তাপমাত্রা ও উপকূলীয় লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট থাকায় খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।

গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কৃষকেরা বোরো ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ ও আশপাশের প্রায় ৪৬ হাজার হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে যায়। এতে জাতীয় চাল উৎপাদনে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়।

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্যোগ হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার সামগ্রিক চিত্রটি পুরোপুরি বোঝা যায় না। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক খাদ্যসংকটসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ সংকটকালীন বা তার চেয়ে খারাপ পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিলেন। বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি নেই এবং বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্যসংকটে থাকা দেশগুলোর তালিকাতেও দেশটি নেই। তবে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় থাকা মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশে রয়েছে।

তবে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। প্রায় ৭৬ লাখ মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তার ওই তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। বড় ধরনের দুর্যোগের অনুপস্থিতি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার মতো বিষয়গুলো এই উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারপরও তুলনামূলক ভালো একটি বছরে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য অনিরাপত্তায় থাকা দেখিয়ে দেয় যে সমস্যাটি কেবল আকস্মিক বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আয় অনিশ্চয়তা, দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তার কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

চলতি বছরের বৃষ্টিপাতের চিত্রেও সেই অস্থিরতার প্রতিফলন দেখা গেছে। এপ্রিলে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আমনের বীজতলা তৈরিতে। জুলাইয়ে আবার স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

একই বছরের মধ্যে বৃষ্টিপাতের এমন বিপরীতমুখী আচরণ কৃষির জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর সক্রিয়তাও এর একটি কারণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই প্রাকৃতিক প্রবণতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে।

৩৪ বছরের বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বর্ষাকালের মোট বৃষ্টিপাত কমে আসার পাশাপাশি টানা বৃষ্টির দিনের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে।

অস্বাভাবিক আবহাওয়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকের ওপর। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে রোপণ ও ফসল কাটার সঠিক সময় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ধানের ফলন ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ এবং গমের ফলন ৩১ থেকে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বোরো ধানের ফলন সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে লবণাক্ততা। খুলনা ও সাতক্ষীরার মতো এলাকায় কোথাও কোথাও মাটির লবণাক্ততা ৪০ ডিএস/মিটার ছাড়িয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে নোনা পানির বারবার প্রবেশে উপকূলের উর্বর মাটির গুণাগুণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট এবং বর্ষায় আকস্মিক বন্যা—দুই ধরনের চাপই উপকূলীয় কৃষকদের ওপর পড়ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

কৃষিতে উৎপাদন কমার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে। জুলাইয়ের টানা বৃষ্টির পর ঢাকার বাজারে বেগুন, করলা ও কাঁচামরিচের দাম এক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কোথাও কোথাও দাম প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে। চালের বাজারেও অস্থিরতা দেখা যায় এবং বোরো মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই কেজিপ্রতি দুই থেকে চার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ে।

খাদ্যের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয় সীমিত এবং বিকল্প খাদ্য বা পণ্য কেনার সক্ষমতাও কম। তাই খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। খাদ্য কেনার সামর্থ্যও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সংকটের কারণে অনেক পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এ পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো আরও দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার প্রয়োজন রয়েছে। খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে, বন্যায় ফসল নষ্ট হলে বা মৌসুমি কাজ হারালে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো দরকার। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, তবে তা নিয়মিত হালনাগাদ এবং স্বচ্ছ রাখতে হবে।

একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। দুর্বল প্রতিযোগিতা, মজুতদারি ও তথ্যের ঘাটতি অনেক সময় মূল্যবৃদ্ধিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকারি খাদ্য মজুতের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো আমদানি এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পাবেন, তেমনি ভোক্তার ওপরও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমবে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা মোকাবিলা, জলবায়ু সহনশীল বীজ, ফসল বিমা, গুদাম সুবিধা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে আলাদা উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে খাদ্য নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জলবায়ু অভিযোজন ও খাদ্যনীতি এখন আর আলাদা বিষয় নয়। বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া, উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং আকস্মিক বন্যার মতো বিষয়গুলো ক্রমেই নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। ফলে খাদ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে একটি আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি বা লবণাক্ত মৌসুম পুরো বছরের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলতে না পারে।

তবে শুধু অভিযোজনের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে ঐতিহাসিকভাবে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায়ও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ হলেও বৈশ্বিক নিঃসরণে দেশটির অবদান তুলনামূলকভাবে কম। তাই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিকভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগও প্রয়োজন।

হাওরের পানিতে তলিয়ে যাওয়া বোরো ক্ষেত থেকে শুরু করে শহরের বাজারে বেড়ে যাওয়া সবজির দাম—সবকিছুর সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের মুখে নেই, এটি স্বস্তির বিষয়। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার প্রকৃত পরীক্ষা হলো—দাম বাড়লে, বন্যা হলে, মৌসুমি কাজ কমে গেলে কিংবা আবহাওয়ার আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে দেশের প্রতিটি পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে কি না।

একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরেকটি প্রশ্ন—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে বৈশ্বিকভাবে যারা বেশি দায়ী, তারা নিজেদের নিঃসরণ কমানোর জন্য কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ