ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়। বছরজুড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজধানী ও বড় শহরের গণ্ডি পেরিয়ে উপকূলীয় ও প্রান্তিক জেলাগুলোতেও রোগটির বিস্তার বাড়ছে। এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের তৈরি মডেলে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট ও খুলনাকে ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও এসব অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দেশের ৫৮টি জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে ৬৪ জেলাতেই। ফলে ডেঙ্গু এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়; প্রত্যন্ত অঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটছে।
তাপমাত্রা বাড়লে বাড়ে মশার সক্রিয়তা
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এডিস মশা শীতল রক্তের প্রাণী হওয়ায় পরিবেশের তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে এর শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমও পরিবর্তিত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে মশার কামড়ানোর হার ও ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণের সক্ষমতা বাড়তে পারে। প্রায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মশার কামড়ানো ও সংক্রমণের প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে উষ্ণ পরিবেশে মশার ডিম পরিপক্ব হওয়ার সময় কমে যায় এবং ভাইরাসের বংশবৃদ্ধিও দ্রুত হয়।
২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে মশার দেহে ভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় প্রায় ১৫ দিন থেকে কমে ৬-৭ দিনে নেমে আসতে পারে। ফলে আক্রান্ত মশা দ্রুত অন্য মানুষকে সংক্রমিত করার সক্ষমতা অর্জন করে।
অনিয়মিত বৃষ্টিতেও বাড়ছে প্রজননস্থল
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে হালকা বৃষ্টির পরিবর্তে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং এরপর দীর্ঘ বিরতির প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘর ও আশপাশে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র বাড়ছে।
ফলে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি বা বাঁধ ভাঙনের বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু ডেঙ্গুর বিস্তারও এই পরিবর্তিত জলবায়ুর অন্যতম স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে।
বদলেছে এডিস মশার আচরণও
এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমা পানিতে বংশবিস্তার করে বলে ধারণা করা হলেও সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে নোংরা বা ড্রেনের পানিতেও এদের বংশবিস্তার দেখা যাচ্ছে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত ধারণা ও পদ্ধতিগুলো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ওই বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ আক্রান্ত হন। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কমে আসবে বলে ধারণা করা হলেও ২০২৫ সালেও লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। এতে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমার পরিবর্তে আরও জটিল হয়ে উঠছে।
প্রচলিত মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে প্রশ্ন
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর বর্ষাকেন্দ্রিক কার্যক্রম জোরদার করা হলেও সারা বছর এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে কিউলেক্স মশাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা, যার প্রজননস্থল সাধারণত বাড়ি ও বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি।
এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও নজরদারির দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের, অন্যদিকে মশার উৎস নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় অংশ স্থানীয় সরকারের দায়িত্বে। দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও কার্যকর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিকল্প ব্যবস্থায় আশার আলো
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয়ভাবে তৈরি প্রযুক্তিও আশার সৃষ্টি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি ‘ডেন-এক্স ট্র্যাপ’ বিদ্যুৎ ছাড়াই কাজ করে। দেশীয় উদ্ভিদজাত উপাদান ব্যবহার করে তৈরি এই ফাঁদ স্ত্রী এডিস মশাকে ডিম পাড়তে আকৃষ্ট করে এবং পরে সেই ডিম নষ্ট করে দেয়। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার ফাঁদ স্থাপন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কম খরচের স্থানীয় প্রযুক্তি দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
সারা বছর নজরদারির তাগিদ
ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালনা না করে সারা বছর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালানোর প্রয়োজন রয়েছে। শুষ্ক মৌসুম থেকেই এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য একত্র করে পূর্বাভাসভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, উপকূলীয় ও প্রান্তিক জেলাগুলোতে রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তারের ধরনও বদলে যাচ্ছে। পুরোনো পদ্ধতিতে শুধু বর্ষাকালে প্রস্তুতি নিলে এই পরিবর্তিত ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তাই জলবায়ু, মশার বিস্তার এবং জনস্বাস্থ্যের তথ্য সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

