রাঙামাটিতে বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও পাহাড়ি ঢলের কারণে বিভিন্ন নদী ও ছড়ার পানি কমছে না। রোববার (১২ জুলাই) বরকল উপজেলার ভুষণছড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এতে পুরো উপজেলায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
বিলাইছড়ি উপজেলায় পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তবে বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ শিলক ব্রিজঘাট সেতুর একটি অংশ ধসে পড়ায় দুই জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত শনিবার সকাল থেকে ওই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম. ইকবাল হোসেইন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য যতদিন প্রয়োজন ততদিন ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে এবং পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য টিন সরবরাহের পরিকল্পনাও করছে বলে তারা জানান।
রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকায় ত্রাণ ও জরুরি সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তীব্র স্রোতের কারণে নৌ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।
জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ স্বাভাবিক না থাকায় কিছু এলাকায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নারী, শিশু ও বয়স্করা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বরকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরাকায়স্থ জানান, প্রবল স্রোত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে গত দুই দিন ধরে চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কুববাং উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রসহ কয়েকটি এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগেও সমস্যা হচ্ছে। তবে রোববার দুপুরে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল ওইসব এলাকায় পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, বিলাইছড়িতে ডুবে যাওয়া গ্রাম ও হাটবাজার থেকে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। শনিবার বিকেল থেকে বৃষ্টিপাত কমে আসায় রাইখ্যং নদীর পানি ও স্রোত কিছুটা কমেছে। এর ফলে ফারুয়া বাজারসহ প্লাবিত বিভিন্ন এলাকা আবার দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানান, নদীর স্রোত কমে আসায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় ফারুয়া ইউনিয়নে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রাণবাহী নৌকা সেখানে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুতই ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা পৌঁছে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাঘাইছড়িতেও পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো ফিরেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও গবাদিপশুর খাদ্যের সংকটে দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। পাশাপাশি ফসলি জমি ও মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকরা।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্রুত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল পর্যন্ত রাঙামাটির ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় চার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রুহুল আমিন বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

