জলবায়ু সংকটে অস্তিত্বের লড়াই, উপকূলজুড়ে বাড়ছে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা

🕙 প্রকাশিত : ৮ জুলাই, ২০২৬ । ১১:৫২ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা আজ চরম অনিশ্চয়তায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিডর, আইলা, আম্পান, সিত্রাং, মোখা ও রেমালের মতো একের পর এক দুর্যোগের ক্ষত এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে প্লাবিত হয় গ্রাম, নষ্ট হয় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যসম্পদ। ফলে দুর্যোগ যেন এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

একসময় ধান উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্তমানে অধিকাংশ জমি লবণাক্ত হয়ে পড়ায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কর্মসংস্থানের সংকটে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প জীবিকার সন্ধানে এলাকা ছাড়ছে। যারা থেকে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই দিনমজুরি বা চিংড়িঘেরের অস্থায়ী কাজের ওপর নির্ভরশীল।

পাইকগাছার সোলাদানা ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, “লোনা পানির মধ্যে থাকতে থাকতে শরীরে নানা ধরনের চর্মরোগ হচ্ছে। পরিবারের নারীরা বিভিন্ন অসুস্থতায় ভুগছেন। আমরা ত্রাণ চাই না, টেকসই বেড়িবাঁধ আর নিরাপদ খাবার পানি চাই।”

স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বাড়ছে।

কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের বহু পরিবার এখনো নিরাপদ পানির সংকটে রয়েছে। স্থানীয় নারীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এক কলস মিঠাপানি সংগ্রহ করতে হয়। গ্রীষ্মকাল ও খরার সময়ে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

স্থানীয়দের মতে, পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, গভীর নলকূপ এবং আধুনিক পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

উপকূলবাসীর দাবি, দুর্যোগের পর সাময়িক ত্রাণ সহায়তার পরিবর্তে প্রয়োজন টেকসই অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিশেষ করে কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও শিবসা নদীর তীররক্ষা, বৈজ্ঞানিকভাবে নির্মিত স্থায়ী বেড়িবাঁধ, নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের ভাষ্য, প্রতিবছর বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বাঁধ সংস্কার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা টেকসই হয় না। ফলে সামান্য জোয়ার বা দুর্যোগেই আবারও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নতুন করে দুর্ভোগ শুরু হয়।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলকে টিকিয়ে রাখতে হলে জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ, নদী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

স্থানীয়দের আশা, জাতীয় বাজেট, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল এবং সমন্বিত সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে উপকূলের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ