ইউরোপজুড়ে চলমান ভয়াবহ তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত কয়েকদিনের দাবদাহে দেশটিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দক্ষিণ ইউরোপে তাপদাহজনিত কারণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থা ‘পাবলিক হেলথ ফ্রান্স’ রোববার এক বিবৃতিতে জানায়, ২৪ জুন থেকে এ পর্যন্ত আগের মাসগুলোর একই সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি।
সংস্থাটি জানায়, যেসব অঞ্চল সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় ছিল, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে প্যারিস ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তাপপ্রবাহে একাকী ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। তবে তারা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য প্রাথমিক এবং প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ফ্রান্স ও স্পেনসহ দক্ষিণ ইউরোপে দাবদাহে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই তাপপ্রবাহে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
গত কয়েকদিন ধরে ইউরোপের বহু দেশে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। জার্মানি, ডেনমার্ক, চেক প্রজাতন্ত্র ও সুইজারল্যান্ডে সর্বকালের বা মাসভিত্তিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটির স্যাক্সনি-আনহাল্ট অঞ্চলে শনিবার তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ডেনমার্কে ১৮৭৪ সালের পর সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্রেও ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে।
ফ্রান্সে কয়েকদিন ধরে অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। প্যারিসের সব হাসপাতালে জরুরি পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে। তপ্ত গাড়ির ভেতর আটকে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এমন তীব্র তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। তাদের মতে, বর্তমানে রাতের তাপমাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, রেল ও সড়ক যোগাযোগেও প্রভাব পড়েছে। হাঙ্গেরিতে দানিয়ুব নদীর পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমানো হয়েছে। সুইজারল্যান্ডেও একটি পারমাণবিক কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মিলান, রোম, ভেনিসসহ ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পো নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
চরম গরমে জার্মানির কিছু রেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং হামবুর্গের কাছে একটি মহাসড়কে ফাটল দেখা দেওয়ায় আংশিক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ‘ওমেগা ব্লক’ নামে উচ্চচাপ বলয়ের কারণে গরম বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপের ওপর আটকে রয়েছে। তবে সপ্তাহ শেষে ধীরে ধীরে তাপপ্রবাহ কমতে পারে এবং কয়েকটি অঞ্চলে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।


