বুধবার

১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নকল ওষুধের ভয়াবহ বিস্তার, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

.রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ উদ্ধার .তৈরি হয় কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার অলিগলিতে .বাজারজাতে জড়িত মিটফোর্ড ওষুধ মার্কেটের অর্ধশতাধিক অসাধু ব্যবসায়ী

🕙 প্রকাশিত : ৯ জুন, ২০২৬ । ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ

দেশে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নকল ও ভেজাল আকারে বাজারে ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওষুধ সেবনে রোগীরা সুস্থ হওয়ার বদলে আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।

সম্প্রতি র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, নয়াবাজার, শ্যামপুর, কদমতলী ও কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধ ও তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে। পরে উদ্ধার করা ওষুধ ও যন্ত্রাংশ ধ্বংস করা হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও জরিমানা দেওয়া হয়।

র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “র্যাবের একার পক্ষে নকল ও ভেজাল ওষুধ নির্মাতাদের দমন করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড, বাবুবাজার ও ইসলামপুর এলাকায় শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নকল ও ভেজাল ওষুধের পাইকারি ব্যবসা চালিয়ে আসছে। কেরানীগঞ্জসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে গোপন কারখানা, যেখানে দেশি-বিদেশি নামিদামি কোম্পানির ওষুধ হুবহু নকল করা হচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া ওষুধের মধ্যে ছিল ডায়াবেটিসের ওষুধ, এন্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল সিরাপ ও ট্যাবলেট, ইনজেকশন, ক্যানসারের ওষুধসহ বিভিন্ন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, নকল ওষুধ শুধু প্রতারণা নয়, এটি মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর খেলা। কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, “ভেজাল ও নকল ওষুধ কিডনি বিকলসহ নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। এটি কার্যত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।”

ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিউনেটাল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনির হোসেন জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে নকল ওষুধের ঝুঁকি আরও বেশি। তিনি বলেন, “এসব ওষুধে শিশুদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, বরং জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।”

একই হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, অনেক সময় শিশুদের জ্বর সাময়িকভাবে কমলেও পরে আবার বেড়ে যায় এবং নতুন উপসর্গ দেখা দেয়, যা নকল ওষুধের কারণে হতে পারে। তিনি স্বীকৃত ফার্মাসিস্ট ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আখতার হোসেন বলেন, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মানবিকতা ভুলে নকল ওষুধ বাজারজাত করছে। তিনি জানান, নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও এ সংকট মোকাবিলায় অধিদপ্তরের জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শিমুল হালদারও নকল ওষুধ প্রতিরোধে ওষুধ প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত অভিযান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ