শফিকের চোখে জল নেই। পাথরের মতো মুখ। মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেলেকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন। শান্তর শরীরে লাল দানা। হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুটির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বড় হাসপাতালেও শেষ রক্ষা হলো না।
হাসপাতালের গেটে শান্তর মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শফিকের জামা টেনে ধরে বললেন, ‘ও শান্তর বাপ, ওরে একটু ডাক দাও! ও তো এমন করে ঘুমানোর কথা না!’
শফিক শুধু আকাশের দিকে তাকালেন। ভাঙা গলায় বললেন, ‘সব শেষ। ও আর ডাকবে না। চলো, ওরে বাড়ি নিয়ে যাই।’
শফিক ছেলেকে নিয়ে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছেন। কোনো গাড়ি থামল না। এক পথচারী থমকে দাঁড়ালেন। নিচু স্বরে বললেন, ‘ভাই, লাশ নিয়ে রোদে হাঁটছেন কেন? গাড়ি ঠিক করেন।’
শফিক ম্লান হেসে বললেন, ‘টাকা নেই ভাই। ছেলের পেছনে সব গেছে। ও এখন বাবার কোলেই ঘুমাক।’
পথচারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে গেলেন। শফিক ছেলের কপালে হাত রাখলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘আর একটু সহ্য কর বাপ, এই তো বাড়ি চলে এসেছি।’
পেছন থেকে মা আবার আর্তনাদ করলেন, ‘ও শান্তর বাপ, ওর হাতটা কেমন ঝুলে আছে! ওরে শক্ত করে ধরো। ওর কষ্ট হচ্ছে!’
শফিক ছেলেকে আরও জাপটে ধরলেন। বললেন, ‘ওর আর কষ্ট নেই। সব কষ্ট এখন আমাদের।’
রাস্তা পার হয়ে তাঁরা এগোচ্ছেন। রোদ কমে আসছে। পেছনে পড়ে রইল হাসপাতাল। সামনে শুধু ছেলেকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। কোনো পুলিশ বা কর্মকর্তা এসে তাঁদের থামাল না। কেউ জানতে চাইল না, ‘কী হয়েছে?’
শফিক ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন। এক বাবা তাঁর সন্তানের মরদেহ নিয়ে হাঁটছেন। কেউ ছবি তুলল, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু শফিক হাহাকার শোনার কেউ ছিল না।
শহরের ভিড়ে আবেগ চাপা পড়ে। এক বাবার নুয়ে পড়া শরীর বলে দিচ্ছিল, সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী আর কিছু নেই। শান্ত চলে গেছে। শফিক এখন এক জ্যান্ত লাশ। ঢাকার রাস্তা সাক্ষী হয়ে রইল এক করুণ ইতিহাসের।


