ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ঘরে ফেরার স্রোত ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানুষ ছুটছে গ্রামের পথে। তবে এই আনন্দযাত্রার আড়ালে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে এক কঠিন বাস্তবতা—সড়ক দুর্ঘটনা।
শনিবার (১৪ মার্চ) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ৩১৪টি এলাকা সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অঞ্চলগুলো শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৩৯টি এলাকা অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ এবং ১৭৫টি এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তালিকাভুক্ত ২১টি অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশের সড়কপথে এমন অনেক স্থান রয়েছে, যেখানে দুর্ঘটনা যেন নিয়মিত ঘটনার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো—প্রায় ৮৫ শতাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি। আধুনিক সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের ফলে যানবাহনের গতি বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই গতিকে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে উন্নত সড়কই অনেক সময় বিপদের উৎসে পরিণত হয়। দেশে নতুন নতুন মহাসড়ক নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করা হলেও এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত নজরদারি কতটা জোরদার করা হয়েছে—তা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
গবেষণা প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাপ্রবণ হওয়ার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও সড়কের নকশাগত ত্রুটি, কোথাও সড়ক বিভাজক বা সতর্কতামূলক চিহ্নের অভাব, আবার কোথাও সড়কের দুই পাশে অনিয়ন্ত্রিত জনবসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বাস্তবে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশে অসংখ্য বাস কাউন্টার, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বা সাধারণ মানুষের রাস্তা পারাপারের কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। যখন সড়ক কেবল যানবাহনের চলাচলের পথ না হয়ে মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়, তখন দুর্ঘটনার আশঙ্কাও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।
এর পাশাপাশি দূরপাল্লার চালকদের বিশ্রামের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালালে চালকের মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়াশক্তি কমে যায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে ২২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি আধুনিক বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়েছিল—কুমিল্লার নিমসার, সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়া, মাগুরার লক্ষ্মীকান্দর এবং হবিগঞ্জের জগদীশপুরে। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও এসব বিশ্রামাগার চালু করা হয়নি। ফলে যে অবকাঠামো চালকদের ক্লান্তি দূর করে দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হতে পারত, তা কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এখানেই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সড়ক উন্নয়ন শুধু ইট, বালু ও বিটুমিনের সমষ্টি নয়; এটি একটি সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। উন্নত সড়কের পাশাপাশি যদি গতিনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি, প্রশিক্ষিত চালক এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামব্যবস্থা না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন অনেক সময় নতুন ঝুঁকির জন্ম দেয়।
ঈদের সময় এই বাস্তবতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কারণ এ সময় সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়নায় অনেক চালক গতিসীমা অমান্য করেন। কখনো কখনো যাত্রীরাও দ্রুত যাত্রার চাপ সৃষ্টি করেন। অথচ একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, তা আমরা প্রায় প্রতি বছরই দুর্ঘটনার খবরের মধ্য দিয়ে দেখতে পাই।
সুতরাং বিষয়টি শুধু অবকাঠামোর নয়; এটি আচরণ, ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নও। ঈদ মানে আনন্দের যাত্রা, প্রিয়জনের কাছে ফেরা। তাই মনে রাখা জরুরি—সড়কে দ্রুত পৌঁছানো নয়, নিরাপদে পৌঁছানোই প্রকৃত সাফল্য।

