বৃহস্পতিবার

১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

টেস্ট ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিমের অনন্য কীর্তি

🕙 প্রকাশিত : ১ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হইল। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক শততম টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি করিয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জাতীয় দলের সাবেক টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করিলেন। এই কৃতিত্ব অর্জন করিবার মাধ্যমে তিনি এক অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করিলেন, যেই ক্লাবে ইতিপূর্বে কতিপয় কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্থান পাইয়াছেন।
মুশফিকুর রহিম একাদশতম ক্রিকেটার হিসাবে শততম টেস্টে শতরান করিবার গৌরব অর্জন করিলেন। এই পর্যন্ত যাহারা এই সম্মান লাভ করিয়াছেন, তাহারা হইলেন: জো রুট (২১৮), ডেভিড ওয়ার্নার (২০০), ইনজামাম-উল-হক (১৮৪), গর্ডন গ্রিনিস (১৪৯), জাভেদ মিয়াঁদাদ (১৪৫), রিকি পন্টিং (১২০ ও ১৪৩), হাশিম আমলা (১৩৪), গ্রায়েম স্মিথ (১৩১), মুশফিকুর রহিম (১০৬), অ্যালেক স্টুয়ার্ট (১০৫) ও কলিন কাউড্রে (১০৪)।
২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের লর্ডসে মাত্র ১৬ বৎসর বয়সে মুশফিকুর রহিম তাহার টেস্ট ক্রিকেটে যাত্রা আরম্ভ করেন। প্রথম জীবনে তিনি বিশেষজ্ঞ উইকেট রক্ষক হিসাবে জাতীয় দলে সুযোগ পাইলেও, কালক্রমে নিজ ব্যাটিং-নৈপুণ্যে তিনি নিজেকে দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। গত দুই দশকে তিনি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান রূপে আবির্ভূত হইয়াছেন। টেস্ট ক্রিকেটে তাহার মোট রান ৬ হাজার ৪৫৭, যাহা টেস্টে বাংলাদেশের হইয়া সবচাইতে অধিক রান।
টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি (২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে) করিবার বিরল কীর্তিও তাহার দখলে। অধিনায়ক হিসাবেও তাহার অবদান অবিস্মরণীয়। সবচাইতে বেশি ম্যাচে (৩৪) যেমন তিনি অধিনায়ক ছিলেন, তেমনি অধিনায়ক হিসাবে সবচাইতে বেশি টেস্ট (৭) জয়লাভও করিয়াছেন তিনি। উইকেটের পিছনে তিনি দীর্ঘকাল বিশ্বস্ততার সহিত দায়িত্ব পালন করিয়াছেন এবং সম্মুখভাগে কঠিন পরিস্থিতিতে ঢালস্বরূপ দাঁড়াইয়াছেন। প্রায় দুই দশকব্যাপী তাহার এই নিরবচ্ছিন্ন অবদান এবং ক্রিকেটের প্রতি তাহার গভীর নিষ্ঠা তাহাকে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ উপাধিতে ভূষিত করিয়াছে। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় নহেন, বরং বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের উত্থানের এক মূর্ত প্রতীক বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ক্যারিয়ার জুড়িয়া খেলাটার প্রতি তাহার যে আত্মনিবেদন, তাহারই পুরস্কার এই অর্জন। ১৫০ বৎসরের টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম হইলেও শততম টেস্ট খেলা ক্রিকেটারের তালিকায় মুশফিক এখন ৮৪তম।
মুশফিকুর রহিমের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য অনুসরণীয়। তাহার ক্রিকেট জীবন হইতে যে প্রধান শিক্ষাটি লাভ করা যায়, তাহা হইল-অদম্য সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের মাহাত্ম্য। বহু বার তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হইয়াছেন, কখনো কখনো তাহার ফর্ম লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে; কিন্তু প্রতিবারই তিনি দৃঢ় মানসিকতা ও নিষ্ঠার দ্বারা প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। তাহার ধৈর্য, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলিতে পারিবার ক্ষমতা এবং সর্বদা দলের প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করিবার মানসিকতা হইতে তাহার উত্তরসূরিদের শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে। এই শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করিয়া তিনি প্রমাণ করিলেন, অভিজ্ঞতা ও ইচ্ছাশক্তির সমন্বয় ঘটিলে বয়সের বাধা অতিক্রম করাও সম্ভব। তাহার এই কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্মকে নিরন্তর কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুগ যুগ ধরিয়া অনুপ্রেরণা জোগাইবে নিঃসন্দেহে।
উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিং নিজের শততম টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন। মুশফিক এখন নিজের শততম টেস্টে পন্টিংকে ছুঁইয়া ফেলিতে পারেন কি না, তাহাই দেখিবার বিষয়। শততম টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তি রহিয়াছে শুধু ডেভিড ওয়ার্নার ও জো রুটের। তাহাদের পার্শ্বে নাম লেখাইতে পারিলে তাহার গৌরবে বাংলাদেশের ক্রিকেটও গৌরবান্বিত হইবে। ইহার পূর্বে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি করিয়াছেন। তাহার দুইটি আবার উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসাবে, যাহার কীর্তি দুনিয়ার আর কাহারো নাই। তাই এমন প্রত্যাশা করাটা আমাদের জন্য অমূলক হইবে না। অভিনন্দন মুশফিকুর রহিম।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ