ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় নির্মিত মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতলে কাঙ্খিত সেবা থাকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগী সাধারন। পরিচালকের নেতৃত্বে শক্তিশালী সিন্ডিকেট জনবল নিয়োগ টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
জানাগেছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মালেক তার বাবার নামে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন করেন। স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নামকরণ করা হয়।
জানা গেছে, ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, পুত্র রাহাত মালেক, স্ত্রী শাবানা মালেক, ঘনিষ্ঠ সহযোগী আফসার সরকার, ফুফাতো ভাই ইসরাফিল হোসেন এবং কর্মকর্তাগনের সমন্বয়ে গঠন করা হয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট।ওই সিন্ডিকেট ভূমি অধিগ্রহণ, অবকাঠা নির্মাণ ও যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ক্রয়ের নামে অগণিত অর্থ লুটে নেয়। ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর জাহিদ মালেক ও তার সহযোগী আত্মগোপনে চলে যায়। তবু থেমে থাকেনি দুর্নীতি অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহিদ মালেকের সবচেয়ে আস্থাভাজন ছিলেন মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) খান মোঃ আরিফ। যিনি এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বড় ৭ টি প্রজেক্টের ডিরেক্টরের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময়ে প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে গেলেও এখন আবারো তিনি মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। গাজীপুরের জেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগের নেতা আমজাদ হোসেন পলাশ ছিলেন সাবেক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো: জাহিদ আহসান রাসেলের পারিবারিক সদস্য । সেই সূত্র ধরেই সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ঘনিষ্ঠ হয়ে যাওয়ার পরেই মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০২১ সালে আউটসোর্সিং এ ১২০ জন জনবল নিয়োগের টেন্ডার পান মেসার্স মিয়া এন্টারপ্রাইজ । এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক পলাশ। সেই পলাশকে টেন্ডার দিয়ে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেই নিজের লোকজনকে ওই হাসপাতালে বহাল রাখতে টেন্ডারের সময় শেষ হবার পর ২০২১ – ২০২২ ও ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে পর পর দুই বার সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পর আবার নতুন টেন্ডার হয় ২০২৩ – ২০২৪ অর্থ বছরে সেই বছরেও সাবেক পরিচালক আশ্বাদ উল্লাহ এর মাধ্যমে আরো ৪০ জন বাড়িতে ১৬০ জন জনবলের টেন্ডার সুকৌশলে পলাশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়। বর্তমান পরিচালক ও সিন্ডিকেটের প্রধান ডা. শফিকুল আলমের সহায়তায় নতুন করে সময় বাড়িয়ে এখনও সেই অদক্ষ জনবল দিয়েই চালানো হচ্ছে কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ‘টেন্ডারের একই ঠিকাদারের আধিপত্য ‘ সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্যারাগন এন্টারপ্রাইজ নামক একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ভিন্ন প্রতিষ্ঠান হলপও ঘুরে ফিরে একই মালিক কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। প্যারাগন এন্টারপ্রাইজ নামক ওই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া টেন্ডারে মাত্র ৭০ টাকার সিরিন্জের দাম ধরা হয় ৩ হাজার ৭’শ ৪৩ টাকা। অন্যান্য সরঞ্জামাদির বাজার মূল্যের চেয়ে বহুগণ বাড়িয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয় সরকারের অগণিত অর্থ। যা সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভাগাভাগি করে নিয়ে থাকে। এমন লোমহর্ষক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও তদন্ত কমিটি গঠন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ওমর ফারুক দিনকালকে জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। কাগজে কলমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কার্যত কোন ফলোদয় হচ্ছে না। মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ও হাসপাতালের পরিচালকের বিরুদ্ধে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি (২৬/০২/২৬) তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন দিনকালকে জানান, আমি ছোট কর্মচারী। ডিসিশন মেকিং এ আমি জড়িত নই।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক খান মোঃ আরিফ বলেন, আমি ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পিডি হিসেবে ছিলাম। আবার ২০২৪ সালের জানুয়ারির ২০ তারিখ থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে এখানে কর্মরত আছি।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মিনহাজ উদ্দিন মিয়া দিন কালকে বলেন, আমি সবকিছু জানিনা। আমাকে সব কিছু জানানো হয় না। তবে আমি কোন দুর্নীতি অনিয়ম মেনে নিব না।
নাম পরিচয় গোপন রেখে ওই হাসপাতালের এক কর্মকর্তা দিনকালকে জানান, স্বৈরাচার সরকারের দোসর মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা.শফিকুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক ডা. এ কিউ এম আশরাফুল হক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সহকারি পরিচালক ডা.এ কিউ এম আশরাফুল হককে অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরের দিন অফিসে যেতে বলেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও পরিচালক ডা.শফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা.শোফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত তদন্ত কমিটির সভাপতি ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

