যমুনার জেগে ওঠা চরে এখন সবুজের সমারোহ। উর্বর পলিমাটিযুক্ত জমিতে সোনালি দিনের স্বপ্ন বুনছেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। নানা ধরনের ফসলের আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। নীরবে গড়ে উঠছে এক কৃষি বিপ্লব—যেখানে যমুনার চর হয়ে উঠেছে স্বপ্নের লড়াইয়ের প্রতীক।
একদিকে নদীভাঙনের হুমকি, অন্যদিকে নতুন করে জেগে ওঠা চর। প্রবাহমান যমুনার ভাঙা–গড়ার খেলায় প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় নদীপাড়ের মানুষদের। একসময় যমুনায় জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকলেও এখন সে চিত্র আর নেই। জীবন ও জীবিকার তাগিদে কোনো জমিই আর অনাবাদী থাকছে না।
স্থানীয়রা জানান, গত প্রায় ২০ বছর ধরে যমুনার বুকে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। প্রতি বছরই একটু একটু করে বাড়ছে চরের পরিধি। নদীর দুই পাড়ের বহু পরিবার নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এসব নতুন চরে আশ্রয় নিয়েছেন। ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে উঠছে জনবসতি। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবল দিয়ে তারা বালুমাটির ওপর পলির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন ফসলের মাঠ।
বর্তমানে এসব চরে ধান, পাট, ভুট্টা, মরিচ, গম, মসুর, খেসারি, ছোলা, চীনাবাদাম, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, রসুন, তিল, তিসি, কালোজিরা, আখ ও মাসকলাইসহ নানা ধরনের ফসলের আবাদ হচ্ছে। যেন বালুচরে এক শস্যবিপ্লব।
সাপধরী ইউনিয়নের কাশারী ডোবা গ্রামের ছকিনা বেগম বলেন, “বাপদাদার বসতবাড়ি প্রায় ৪৫ বছর আগে নদীতে ভেঙে যায়। তখন পাশের জেলায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে জীবন কাটিয়েছি। এখন জমি আবার জেগে ওঠায় নতুন করে ঘরবাড়ি করেছি।”
ষাটোর্ধ্ব কৃষক আহেদ আলী বলেন, “বর্ষা মৌসুমে চর পানির নিচে থাকে। বালুমাটির ওপর পলি জমে, তাই ফলন ভালো হয়। এই জমি আবাদ করেই এখন আমাদের সংসার চলে।”
আরেক কৃষক আব্দুল্লাহ শেখ জানান, “বাপদাদার ভিটায় মাটি কেটে উঁচু করে আবার ঘর তুলেছি। জমি এক ফসলি, পাঁচ মাস বন্যার পানিতে থাকে। পানি নামলেই পলিমাটিতে চাষ করি। এতে সার লাগে কম, খরচও কমে।”
তবে কৃষকদের অভিযোগ, নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চরে ব্যাপক আবাদ হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের তেমন উপস্থিতি নেই। নিজেদের উদ্যোগেই তারা চাষাবাদ করছেন। শুষ্ক মৌসুমে কৃষি বিভাগ যদি গভীর নলকূপ বা সেচের ব্যবস্থা করে, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়বে বলে তাদের দাবি।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ বলেন, চরাঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ফসল আবাদ করছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এ এলাকার উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

