দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরাস্রোতা ছোট যমুনা নদী এখন প্রায় মৃতপ্রায়। পানি শুকিয়ে গিয়ে নদীটি অনেকাংশে মরা খাল কিংবা নালায় পরিণত হয়েছে। নদীর বুক জুড়ে এখন দেখা যায় কৃষকদের বিভিন্ন ফসলের আবাদ। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় নদীর এমন করুণ দশা হয়েছে। সরকারিভাবে নদীটি পুনঃখনন করা হলে আবারও আগের রূপ ফিরে পেতে পারে ছোট যমুনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ছোট যমুনা নদীটির উৎপত্তি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্যাকুড়ি এলাকায় ইছামতি নদী থেকে। সেখান থেকে নদীটি ফুলবাড়ী উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিরামপুর উপজেলার কাটলা সীমান্ত ঘেঁষে হাকিমপুর উপজেলার হিলি সীমান্তে গিয়ে ভারতের ভেতরে প্রবেশ করেছে। পরে আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার ত্রিমোহনী এলাকায় যমুনা ও আত্রাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ৫৩ কিলোমিটার অংশ ফুলবাড়ী উপজেলায় প্রবাহিত হয়েছে। নদীটির গড় প্রস্থ প্রায় ৮৫ মিটার।
এক সময় এই নদীর পানি ব্যবহার করে তীরবর্তী এলাকার কৃষকরা সেচ দিতেন এবং নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। নদীর মাছ দিয়ে স্থানীয় মানুষের চাহিদাও পূরণ হতো। কিন্তু বর্তমানে নদীতে পানি না থাকায় দেশি মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে অল্প কিছুদিনের জন্য নদীতে পানি এলেও তা স্থায়ী হয় না। মাত্র ১৫ থেকে ২৫ দিন পানি থাকার পর আবারও শুকিয়ে যায় নদীটি। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর দু’পাশে সেচের পানির অভাবে কৃষকরা চাষাবাদ করতে পারছেন না।
এদিকে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদীর প্রস্থও দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে নদীটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুলবাড়ী পৌরসভায় স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় শহরের ময়লা-অবর্জনা নদীর বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশে আবর্জনার স্তূপ জমে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে।
উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের কৃষক জিল্লুর রহমান, বাবু ইসলাম ও আতিয়ার রহমান বলেন, এক সময় খয়েরবাড়ী ও দৌলতপুর এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট যমুনা নদীটি স্থানীয়দের জন্য আশীর্বাদ ছিল। নদীটি গভীর ছিল এবং এর পানি দিয়ে তীরবর্তী জমিতে চাষাবাদ হতো। অনেকেই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় নদীর গভীরতা কমে গেছে। বর্তমানে নদীতে প্রায় সারা বছরই পানি থাকে না। বর্ষায় অল্প সময়ের জন্য পানি থাকলেও বাকি সময় শুকনো থাকে। ফলে নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে অনেকেই ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার বলেন, দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৬৪ প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া এবং পানিদূষণ এর অন্যতম কারণ। নদী-নালা ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার ফলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।
ফুলবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুল হুদা চৌধুরী লিমন বলেন, জাইকা প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছিল। তবে জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বরাদ্দ ফেরত গেছে। তিনি দাবি করেন, পৌরসভা থেকে নদীতে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে না। এরপরও কেউ যদি বর্জ্য ফেলে থাকে, তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক সামিউল ইসলাম বলেন, পৌরসভার বর্জ্য নদীতে ফেলার বিষয়টি তার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, নদীদূষণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফুলবাড়ীর ছোট যমুনা নদীর দূষণ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকেও জানানো হবে।

