মনের সার্বজনীন ব্যায়াম হচ্ছে ধ্যান বা মেডিটেশন। যেকোনো বয়সের মানুষ প্রতিদিনই এটি চর্চা করতে পারেন। মেডিটেশনের চর্চা বহু প্রাচীন। এটি আসলে মনের ব্যায়াম। মনকে স্থির করার বহু পুরনো এক পদ্ধতি। মনকে ভালো রাখার অব্যর্থ হাতিয়ার। মনের শক্তিকে নানা কাজে লাগানোর পরীক্ষিত প্রক্রিয়া। মনকে প্রশান্ত করে শরীর সুস্থ রাখার এক কার্যকর অনুশীলন; যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, নিয়মিত মেডিটেশন মনকে স্থির করে, আনে প্রশান্তি। মানুষকে সচেতন করে তোলে সার্বিকভাবে এবং বদলাতে সাহায্য করে মনোদৈহিক অস্তিত্বের একেবারে ভেতর থেকে। দেহকোষ ও শরীরবৃত্তীয় কর্মকান্ডকে
গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভ’মিকা রাখে মেডিটেশন। নিয়মিত মেডিটেশন অনুশীলনে মন হয় প্রশান্ত ও অচঞ্চল। স্নায়ুপেশী হয় শিথিল। মন চাপমুক্ত হওয়া এবং দেহের শিথিলায়নের ভেতর দিয়ে কমে যায় মনোদৈহিক রোগের ঝুঁকি। বৃদ্ধি পায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে শারীরিক সুস্থতার পরিমাণও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্মিলো ক্যান্সার হাসপাতালের গবেষক ডা. গ্যারি সোফার-এর মতে, ‘মেডিটেশন যদি কোনো ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল হতো, তাহলে প্রত্যেক চিকিৎসক রোগীর প্রেসক্রিপশনে এর কথা লিখে দিতেন।’ উন্নত বিশে^ বহু পূর্বেই মেডিটেশনকে ‘অল্টারনেটেভ মেডিসিন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ প্রেসক্রিপশনে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে মেডিটেশন চর্চার পরামর্শ দিচ্ছেন।বাংলাদেশেও ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল হার্ট
ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ মিলিতভাবে এক গাইডলাইনে রোগীদের মেডিটেশনে উদ্ভুদ্ধ করতে চিকিৎসকদেরকে পরামর্শ দেয়। মেডিটেশন চর্চায় শিক্ষার্থী হলে বাড়ে মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ। কমে যায় পরীক্ষাভীতি। সুস্পষ্ট হয় জীবনের লক্ষ্য। যা বর্তমান সময়ের জেন-জিদের জন্য খুবই জরুরি। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর প্রথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের মেডিটেশন শেখানো হচ্ছে। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ভারতে দিল্লির স্কুলগুলোতে শুরু হয়েছে হ্যাপিনেস ক্লাশ, যেখানে শিশুদের দেয়া হচ্ছে মেডিটেশন ও আনন্দময় জীবনের শিক্ষা। ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো এবং ইউনিভার্সিটি অব মেলবের্ন-এর মতো খ্যাতনামা বিশ^বিদ্যালয়গুলো দিচ্ছে মেডিটেশন চর্চা করে সুখী হওয়ার পাঠ। দেহ-মনের ভালো থাকার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেটির ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পেশা জীবনে। চাকরিজীবী হলে বাড়ে কাজের প্রতি আন্তরিকতা। বাড়ে নিজের কাজ সবচেয়ে ভালভাবে করার প্রত্যয়। ব্যবসায়ী হলে বাড়ে শান্তভাবে সকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সক্ষমতা। গৃহিণী হলে বাড়ে ধৈর্য্য ও মমতা। যা সঠিক প্যারেন্টিংয়ের মৌলিক শর্ত। যা পরিবারকে করে সুখী ও সফল। পরিবারকে সুখী করার জন্যে মেডিটেশন এখন বহু কাউন্সেলরের আবশ্যকীয় পরামর্শ উপাদান। কেননা মন যখন সমমর্মী তখন যে কোনো সম্পর্কই হয়ে ওঠে আরো সুন্দর। এসবের বাইরে আত্মিক উন্নতির জন্যে মেডিটেশনের ভূমিকা বলাই বাহুল্য। নিয়মিত চর্চাকারীরা হয়ে ওঠেন আগের চেয়ে আরো বেশি মানবিক। একত্রিত হন সেবামূলক নানা কাজে।
দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করেন অনুজীববিজ্ঞানী, লেখক, অনুবাদক, আলোকচিত্রী ও বৌদ্ধভিক্ষু ড. ম্যাথু রিকার্ড। তার আরেকটি পরিচয় তিনি বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ। তার ভাষায়, মেডিটেশন স্থায়ী ও অনন্ত
সুখের মূল উপাদান। মনের যতœ নিতে প্রতিদিন আধা ঘন্টা মেডিটেশন চর্চার পরামর্শ দেন তিনি। মেডিটেশন আসলে কী? এটি ভালভাবে না বুঝলে এটি অভ্যাস করা সম্ভব নয়। সৃষ্টির যেকোনো কিছু যখন তার স্বাভাবিক গতিতে চলে, তাতে যদি বাধা দেওয়া হয় বা থামানো হয়, তবে সেখান থেকে এক বিশেষ ধরনের শক্তির সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ, নদীর পানি বয়ে চলেছে; যদি নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া হয় এবং কোনো যান্ত্রিক উপায়ে সেই পানিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে নতুন শক্তি অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সূর্যের আলো যদি একটি আতশি কাঁচের (সধমহরভুরহম মষধংং) ভেতর দিয়ে যায়, তবে সেখানে তাপ তৈরি হয় যা তুলা বা কাগজকে পুড়িয়ে দিতে পারে। একইভাবে, মানুষের মন যা সবসময় অস্থির এবং অনবরত কিছু না কিছু ভাবছে, তাকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে মানুষ এক বিশেষ শক্তির অধিকারী হতে পারে। মেডিটেশন কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নারী- পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য। মেডিটেশনের প্রকৃত অর্থ হলো মনকে নিয়ন্ত্রণ করা। চিন্তার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহকে এখানে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলে কী পাওয়া যায়? প্রথম ফল হলো মানসিক শান্তি, একটি শান্ত মন যা ভালো বা মন্দের দ্বারা বিচলিত হয় না এবং যা ক্রোধ, কাম ও লোভ থেকে মুক্ত। অনেক ধনী ব্যক্তি ও বড় শিল্পপতিরা প্রায়ই বলেন যে সম্পদ, ক্ষমতা এবং পদমর্যাদা থাকা সত্ত্বেও তাদের মনে শান্তি নেই। এটি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মনের বিভিন্ন ত্রুটিগুলো দূর হলে মন শান্ত হয়। মেডিটেশনের উদ্দেশ্য হলো মনের সব অনিয়মিত কাজ দূর করা এবং দিব্য গুণাবলী অর্জন করা। মেডিটেশন হলো মনের একাগ্রতা, যা কিছু সাধারণ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়- স্বর্ণকার: একজন স্বর্ণকার যখন একটি দামি হীরা বা সোনার নেকলেস তৈরি করেন, তিনি কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন ধরে একমনে কাজ করেন। সেই সময় তার পুরো মন থাকে শুধু সেই নেকলেসটির ওপর। তিনি খাওয়ার কথাও ভুলে যেতে পারেন, এমনকি খাওয়ার সময়ও তার মন সেই কাজের মধ্যেই থাকে।
চিকিৎসক: একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ যখন অস্ত্রোপচার করেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে তার পুরো মনোযোগ থাকে কেবল রোগীর হৃদপি-ের ওপর। তখন তিনি তার ব্যক্তিগত সমস্যা, ক্ষুধা বা তৃষ্ণার কথা ভাবেন না। চালক: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের চালক বা একজন বাস চালককে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। সিগন্যাল এবং রাস্তার দিকে তার পূর্ণ মনোযোগ থাকে। একটু অসাবধানতা বড় বিপদ ঘটাতে পারে। এই সব কাজের পেছনে কোনো না কোনো মজুরি, বেতন বা ফি পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু এই একই একাগ্রতা যখন কোনো ফলের আশা না করে সৃষ্টিকর্তার দিকে নিবেদিত হয়, তখন মন অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী হয়। এই পৃথিবীর জীবন একটি মায়ার মতো। কেউ বলতে পারে না যে সে পরের দিনটি বেঁচে থাকবে কি না। গতকাল যে জীবিত ছিল, আজ সকালে হয়তো তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এবং সন্ধ্যার মধ্যে তার দেহ নিথর হয়ে যাচ্ছে। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা আছে। নবী-রসুল, পয়গম্বর, ধর্মগুরু, সাধক, সুফি-দরবেশ এরা জীবনের সত্যিকার অর্থ বুঝতে পেরেছেন। তারা মেডিটেশনের মাধ্যমে চঞ্চল মনকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বা আত্মাকে প্রশান্ত করে সত্যকে জানতে পেরেছেন এবং সত্যিকার সুখের সন্ধান পেয়েছেন।
মেডিটেশন হলো মনের এমন একটি অবস্থা যা সবসময় একাগ্র এবং কুচিন্তা থেকে মুক্ত। এই পৃথিবীতে সাফল্য-ব্যর্থতা, সুখ-দুঃখ, বন্ধু-শত্রুÑসবই দ্বৈততা। মেডিটেশনের মাধ্যমে মন এই দ্বৈততার দ্বারা প্রভাবিত হয় না।
যেকোনো কাজের জন্য যেমন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, মেডিটেশনের জন্যও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। শান্ত কোনো জায়গা বেছে নিতে হবে, যেখানে কোলাহল নেই, বা তুলনামূলক কম। মেঝেতে মাদুর বা কার্পেটে কিংবা চেয়ারে বসা যেতে পারে। অন্তত আধাঘন্টা একইভাবে থাকা যাবে, এমন আরামদায়ক ও স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে বসতে হবে। চেয়ারে বসলে দুই পায়ের পাতা যেন মেঝেতে সমানভাবে লেগে থাকে। দুই হাত হাঁটুর ওপরে রাখতে হবে। সহজ হয়ে বসতে হবে যেন দেহে কোনো আঁটসাঁট ভাব না থাকে। পোষাক ডিলেঢালা ও আরামদায়ক হলে সবচেয়ে ভালো। এরপর মেডিটেশনের প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণের মাধ্যমে নিজের মেধা ও সম্ভাবনাকে বন্দি করে রাখা অদৃশ্য শেকলগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। যে- কোনো সময় যে-কোনো জায়গায় মেডিটেশন করা সম্ভব। যানজটে বসেও একজন মানুষ নিজের ভেতরে ডুব দিতে পারে। এতে অস্থির-চঞ্চল মনটার ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে। হাসি-ঠাট্টা বা খেলাধুলায় মূল্যবান জীবন নষ্ট করা উচিত নয়। জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত পরম সত্যকে জানা এবং সেই পথে অন্তত কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। অস্থির ও অশান্ত মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন নিরন্তর অভ্যাস, একাগ্রতা এবং বিশ্বাস। এমনকি চিকিৎসাবিজ্ঞানও এখন মেডিটেশনের গুরুত্ব স্বীকার করে। মেডিটেশন এখন সারা পৃথিবীতে স্বাস্থ্যসেবার অংশ। গত অর্ধ শতক ধরে বিশ্বের প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিচালিত হাজারো গবেষণা-প্রতিবেদনে প্রমাণ মিলেছে,
অসংক্রামক ব্যাধিমুক্তি ও সুস্বাস্থ্য অর্জনে মেডিটেশন ও সুস্থ জীবনাচার যে- কোনো বিচারেই নিরাপদ ও পাশর্^প্রতিক্রিয়ামুক্ত বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি। বাংলাদেশ সরকার ২০২২ সালে মেডিটেশনকে পরিপূরক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। কারণ রোগ নিরাময়, প্রতিরোধ ও প্রশমনে মেডিটেশনের ভূমিকা এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। পৃথিবীর প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হচ্ছে এ-সম্পর্কিত যত কোর্স। মনোবিজ্ঞান তো বটেই, এর পাশাপাশি ধর্মশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র এবং যুক্তিবিদ্যার একটা বিরাট অংশ জুড়ে আছে মন। এরিস্টটল প্লেটো দেকার্তে থেকে শুরু করে বহু দার্শনিক মন নিয়ে চিন্তা করেছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষ আট সেকেন্ডের বেশি মনকে স্থির রাখতে পারে না। আর এই সদা চঞ্চল মনকে নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যেই মেডিটেশন প্রয়োজন। সহজ কথায়, এতে শরীর শিথিল হয়। মনে প্রশান্তি আসে। টেনশন দূর হয়। আর মন সুস্থ থাকলে শরীরও সুস্থ থাকে।বাংলাদেশে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মেডিটেশন চর্চাকে জনপ্রিয় করেতুলছে ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার সদস্য শুভানুধ্যায়ী নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেরা আগের চেয়ে ভালো আছেন। অন্যদেরকেও রাখছেন ভালো। যুক্ত হচ্ছেন সামাজিক-মানবিক নানান কাজে। আরও আরও মানুষ যুক্ত হোক ভালো থাকার এই মিছিলে এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সকলের।
লেখক: কোয়ান্টাম গ্র্যাজুয়েট

