বৃহস্পতিবার

২৬শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উৎসব এলেই কেন বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনা? কাঠামোগত ব্যর্থতায় প্রাণহানির শঙ্কা

🕙 প্রকাশিত : ২৫ মার্চ, ২০২৬ । ৫:৫০ পূর্বাহ্ণ

উৎসব মানেই আনন্দ, মিলন আর স্বস্তির বার্তা। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, এই আনন্দঘন সময়েই সড়কে নেমে আসে মৃত্যুর মিছিল। সদ্য ঈদের দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে—এই মৃত্যু কি অনিবার্য, নাকি আমাদের অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতারই ফল?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ পুলিশের গবেষণা অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ ঘটে বেপরোয়া গতির কারণে এবং ২৯ শতাংশ সড়কের নাজুক অবস্থার জন্য। ঈদের সময় ফাঁকা সড়ক পেয়ে অনেক চালকই যেন নিয়ন্ত্রণহীন গতির প্রতিযোগিতায় নামেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদকেন্দ্রিক দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। ২০২২ সালে ১৬৪টি দুর্ঘটনায় ১৪৫ জন, ২০২৩ সালে ১৬৫ দুর্ঘটনায় ১৬৭ জন এবং ২০২৫ সালে ১৩৫ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান একটি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির দিকেই ইঙ্গিত করে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল চালকদের দায় দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অভাবে চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে হয়, যা ক্লান্তি বাড়িয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি অদক্ষ ও অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যাও কম নয়। সড়ক অবকাঠামোর দুর্বলতা—যেমন জেব্রা ক্রসিংয়ের অভাব, অপর্যাপ্ত সাইনেজ ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি—পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

আইন থাকা সত্ত্বেও তার কার্যকর প্রয়োগ না হওয়াও বড় একটি সমস্যা। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এ বেপরোয়া চালনায় মৃত্যুর জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়। ফলে আইনের ভয় কার্যত কমে গেছে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত, আতঙ্ক ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগেন। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ফেলে দিতে পারে।

অন্যদিকে, রেলপথেও একই ধরনের অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যায়। কুমিল্লার একটি রেলক্রসিংয়ে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু দেখিয়েছে, নিরাপত্তাহীনতা কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে দায় চাপানো হয় নিম্নস্তরের কর্মীদের ওপর, কিন্তু উচ্চপর্যায়ে জবাবদিহির অভাব থেকেই যায়।

এই পরিস্থিতিতে করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ জরুরি। দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার এবং মোটরসাইকেল ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ—যেমন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা ও আরোহীর সংখ্যা সীমিত রাখা—কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। সড়ককে প্রতিযোগিতার জায়গা নয়, বরং নিরাপদ চলাচলের মাধ্যম হিসেবে দেখতে হবে। তা না হলে উৎসবের আনন্দ বারবারই পরিণত হবে শোকের মিছিলে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ