সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য “ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা” বাধ্যতামূলক বিষয়। আট বছর ধরে প্রতিবছর ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণও হচ্ছে। কিন্তু অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় শিক্ষকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ—দীর্ঘ এই পাঠ্যক্রম শেষ করেও বহু শিক্ষার্থী শুদ্ধভাবে পবিত্র কোরআন শরিফ দেখে পড়তে পারে না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান পাঠ্যবই ও মূল্যায়ন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে।
পাঠ্যক্রমে তাত্ত্বিক জোর, ব্যবহারিক ঘাটতি
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে আকিদা, ইবাদত, নৈতিকতা, ইসলামের ইতিহাস, মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কোরআন তিলাওয়াত শেখানোর অংশ তুলনামূলক সীমিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা ও সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে কিছু তথ্য গত ও সৃজনশীল জ্ঞান পেলেও ইসলাম ধর্মের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পবিত্র কোরআন শুদ্ধ ভাবে পাঠে নেই উল্লেখযোগ্য কোন সফলতা।
শিক্ষার্থীরা জানায়, “ পরিক্ষায়তো নম্বর পাই, কিন্তু শুদ্ধভাবে পড়তে পারি না”।
একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রফসান আল আরাবী জানায়,”ইসলাম শিক্ষা বইয়ে অনেক কিছু পড়েছি—ইতিহাস, হাদিস, নৈতিকতা। পরীক্ষায় ভালো নম্বরও পেয়েছি। কিন্তু কোরআন শুদ্ধভাবে পড়তে আলাদা করে হুজুরের কাছে যেতে হয়েছে।”
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানায়,“স্কুলে সময় কম থাকে। স্যার বইয়ের প্রশ্ন-উত্তর বেশি পড়ান। তাজবীদ শেখানোর সুযোগ কম।”
অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন “তাহলে আমরা আট বছরের পাঠের ফল কী পেলাম?”
একজন অভিভাবক বলেন,
“আমার ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু কোরআন ঠিকমতো পড়তে পারে না। পরে মক্তবে ভর্তি করাতে হয়েছে। তাহলে স্কুলের বাধ্যতামূলক ইসলাম শিক্ষা বইয়ের উদ্দেশ্য কী?”
মানিকগঞ্জ ৮৮ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অবিভাবক আলাউদ্দিন সুমন জানান,
“আমরা চাই, অন্তত প্রাথমিক শেষ করার আগেই সন্তানরা শুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে শিখুক। সেটা যদি স্কুলেই নিশ্চিত হতো, ভালো হতো।”
কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কথা জানিয়ে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন,
“আমাদের বইয়ে কোরআনের অংশ আছে, কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষার আলাদা মূল্যায়ন নেই। ক্লাসের সময়ও সীমিত। বড় শ্রেণিকক্ষে ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তিলাওয়াত শোনা কঠিন।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মাধ্যমিক শিক্ষক জানায়,“লিখিত পরীক্ষায় ১০০ নম্বর থাকলেও তিলাওয়াতের জন্য নির্দিষ্ট নম্বর নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা নম্বর পাওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়, শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত দিকে নয়। আর সত্যি বলতে আমরাও তেলাওয়াত শেখার দিকে নজর দেইনা আমরাও নাম্বারের দিকেই শিক্ষার্থীদের বেশি উৎসাহিত করি।”
মক্তবের অভিজ্ঞতা: এ ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ে দৃশ্যমান ফল দেখা যায় মক্তব বা মসজিদ ভিত্তির কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমে।
মসজিদভিত্তিক মক্তবের একজন শিক্ষক দিদারুল ইসলাম জানান,
“প্রতিদিন এক থেকে দেড় ঘণ্টা নিয়মিত অনুশীলন করালে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শিশুরা শুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে পারে। এখানে শুধু পড়া শেখানোই মূল লক্ষ্য।”
বিশিষ্ট আলেম মাওলানা হাবিবুর রহমানের মতে, বিদ্যালয়ে ইসলাম শিক্ষা বিষয়টি জ্ঞানভিত্তিক হলেও কোরআন তিলাওয়াত একটি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, যা নিয়মিত অনুশীলন ও মৌখিক মূল্যায়ন ছাড়া সম্ভব নয়।”
সংস্কারের প্রস্তাব: প্রাথমিকেই দক্ষতা নিশ্চিতের দাবি
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব—
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির মধ্যে ধাপে ধাপে কোরআন ও তাজবীদ শিক্ষা সম্পন্ন করা।
লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি অন্তত ৩০-৪০ নম্বরের ব্যবহারিক তিলাওয়াত পরীক্ষা চালু করা।
ইসলাম শিক্ষা শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
পৃথক “কোরআন শিক্ষা ও তাজবীদ” মডিউল সংযোজন।
সুনামধন্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম মানিকগঞ্জের মুহতামিম হাফেজ মাওলানা ওবায়দুল্লাহ বলেন,“ধর্মীয় শিক্ষার লক্ষ্য কেবল তথ্য জানা নয়; বরং শুদ্ধ তিলাওয়াত ও নৈতিক চর্চা নিশ্চিত করা। প্রাথমিক স্তরেই যদি এটি বাধ্যতামূলক দক্ষতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে ফল আরও কার্যকর হবে। তবে তাজউয়ীদ ও তারতীলসহ শুদ্ধ কুরআন শেখাতে দক্ষ হাফেজ শিক্ষকদের বিকল্প নেই।
এক্ষেত্রে সরকার স্বীকৃত কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড আল হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যা বাংলাদেশের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।”
একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পাঠ্যবইয়ে কোরআনের কিছু অংশ আছে, কিন্তু নিয়মিত তাজবীদ অনুশীলন বা পৃথক ব্যবহারিক মূল্যায়ন না থাকায় শিক্ষার্থীরা শুদ্ধ উচ্চারণে দক্ষ হয়ে ওঠে না।”
মক্তব বনাম বিদ্যালয়ের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গ্রামীণ এলাকায় মসজিদভিত্তিক মক্তবে শিশুদের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কোরআন শরিফ শুদ্ধভাবে পড়তে শেখানো হয়। সেখানে প্রতিদিনের অনুশীলন, হরফ চেনা, মাখরাজ ও তাজবীদের নিয়মের ওপর জোর দেওয়া হয়।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ে সপ্তাহে সীমিত ক্লাস, বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী এবং সময়সংকটের কারণে তিলাওয়াত শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ থাকে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বেসরকারি বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক বলেন, “আমার সন্তান পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষা বইয়ে ভালো নম্বর পেয়েছে। কিন্তু কোরআন শুদ্ধভাবে পড়তে আলাদা করে মক্তবে পাঠাতে হয়েছে।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক অভিভাবকরাও। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয়ে আট বছর বাধ্যতামূলক পাঠের পরও যদি আলাদা করে মক্তবে পাঠাতে হয়, তবে কি পাঠ্যক্রমে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি?
কারিগরি ক্ষেত্রে বাংলাদেশে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ ফারুক হোসেনের মতে, “ধর্মীয় শিক্ষা কেবল পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞানচর্চা নয়; এটি দক্ষতাভিত্তিক হওয়া উচিত। তাঁর প্রস্তাব—
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ধাপে ধাপে কোরআন পাঠ ও তাজবীদ শেখানো বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং
লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি নির্দিষ্ট নম্বরের ব্যবহারিক (মৌখিক) তিলাওয়াত পরীক্ষা চালু করা।
ইসলাম শিক্ষা শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা উচিত। একই সাথে প্রাথমিক স্তরে পৃথক “কোরআন শিক্ষা” মডিউল সংযোজন প্রয়োজন।”
ইলসামি শিক্ষাবীদদের মতে , যদি পঞ্চম শ্রেণি সমাপনী পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত করতে না পারে, তবে লক্ষ্যভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
নীতিগত সংস্কারের দাবি করে
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন দায়িত্ব নেওয়া সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ক্ষেত্র হতে পারে। ধর্মীয় শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও ফলপ্রসূ করতে পাঠ্যবই পুনর্বিন্যাস, ব্যবহারিক মূল্যায়ন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ জরুরি।
ধর্মীয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নৈতিকতা ও আদর্শ গঠন হলেও মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য কোরআন শরিফ শুদ্ধভাবে পড়তে পারা একটি মৌলিক দক্ষতা। আট বছরের বাধ্যতামূলক পাঠ শেষে যদি সেই দক্ষতা অর্জিত না হয়, তবে পাঠ্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়টি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সময়ের দাবি—এটি যেন কেবল পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম হয়।
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের অভিমত, প্রাথমিক স্তরেই বাধ্যতামূলক শুদ্ধ কোরআন পাঠ নিশ্চিত করতে পারলে ধর্মীয় শিক্ষার মান ও কার্যকারিতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : গণমাধ্যম কর্মী

