বৃহস্পতিবার

২রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

লটারি বাতিলে আবারও সক্রিয় ভর্তি কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যের শঙ্কা

🕙 প্রকাশিত : ২ এপ্রিল, ২০২৬ । ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

স্কুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তিতে লটারি প্রথা বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্তের পর রাজধানীসহ সারা দেশে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য। অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত পড়ার চাপ বাড়ছে এবং গড়ে উঠছে নতুন করে ভর্তি কোচিং নির্ভর একটি বিশাল বাজার।

মোহাম্মদপুরের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসাক এখন থেকেই তৃতীয় শ্রেণির ভর্তি কোচিংয়ে অংশ নিচ্ছে। নিয়মিত একাডেমিক পড়াশোনা কমিয়ে সে এখন ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় দিচ্ছে। তার লক্ষ্য সেন্ট যোসেফ স্কুল ও রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হওয়া।

ইসাকের মা আয়শা বেগম বলেন, “এখন থেকে ইসাকের স্কুলে কম পাঠাবো, কোচিংয়ে বেশি দেব। যাতে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সেন্ট যোসেফ বা রেসিডেনসিয়ালে সুযোগ পায়।”

শুধু ইসাক নয়, তার মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী এখন একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি ভর্তি কোচিংকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ভর্তি কোচিং সেন্টার, যেখানে “ভর্তির গ্যারান্টি”সহ নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অনেক কোচিং সেন্টার পত্রিকার ভেতরে লিফলেট বিতরণ করছে, যেখানে পূর্ববর্তী সফল শিক্ষার্থীদের ছবি ও নামিদামি স্কুলে ভর্তির “সাফল্যগাথা” তুলে ধরা হচ্ছে।

২০১৯ সাল থেকে রাজধানীর নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিবাণিজ্য ও কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি চালু করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই সিদ্ধান্তের পর কোচিং ব্যবসায় ভাটা পড়ে এবং ভর্তিবাণিজ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক আদেশে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ঘোষণার পর থেকেই কোচিং সেন্টারগুলোতে নতুন করে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে সাধারণত এলাকাভিত্তিক বা ক্যাচমেন্ট এরিয়া পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সেখানে সব স্কুলের মান প্রায় সমান হওয়ায় “এলিট স্কুল” কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, “সব এলাকায় মানসম্মত স্কুল না থাকায় লটারি পদ্ধতিই ছিল তুলনামূলকভাবে ন্যায়সঙ্গত। এটি বাতিল হলে আবারও বৈষম্য বাড়বে, যেখানে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা সুযোগ পাবে, আর গরিব পরিবারের শিশুরা পিছিয়ে পড়বে।”

অভিভাবকরাও এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “লটারি বন্ধের ফলে আবারও ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

এদিকে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ইতোমধ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য রেজিস্ট্রেশন শুরু করেছে বলে জানা গেছে। একাধিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে জানাচ্ছে, নির্দিষ্ট ফি-তে তারা শিক্ষার্থীদের “ভর্তির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত” করবে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও লটারি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও কোচিং বাণিজ্য বাড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও গভীর করবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ