কালের সাক্ষী তেওতা জমিদার বাড়ি নিয়ে কিছু জরুরি কথা বলা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যারা ফেসবুকে সক্রিয়, তারা বিষয়টি বেশি বেশি প্রচার করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা।
প্রসঙ্গত:
ইদানীং দেশের অনেক ইউটিউবার, ব্লগারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে—তারা তেওতা জমিদার বাড়ির বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ভিডিও ধারণ করে সেখানে ভুল তথ্যভিত্তিক স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন করছেন। এতে তাদের ভিউ বাড়লেও প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। তৎকালীন জমিদারদের নতুন প্রজন্মের কাছে ভিলেন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
মূল কথা
দর্শনার্থীদের জন্য কিছু বিষয় জানা জরুরি। তেওতার জমিদারদের ইতিহাসে ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরা প্রয়োজন। যারা ভুল তথ্য প্রচার করছেন, তারা আশা করি ভবিষ্যতে সঠিক তথ্য যাচাই করে মতামত দেবেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, তেওতা জমিদারদের ইতিহাস উপস্থাপনে কিছু তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে। কেবল নেতিবাচক দিক নয়, ইতিবাচক অবদানগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা উচিত।
#ইতিহাস যা বলে
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন জমিদাররা ছিলেন সংস্কৃতিমনা ও উদার চিন্তার অধিকারী। তাঁদের আমন্ত্রণে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কবি, সাহিত্যিক ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা এ অঞ্চলে আসতেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমন সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল লক্ষণীয়। বিশেষ করে কলকাতার ফুটবল দলগুলো বছরে একাধিকবার এখানে এসে অংশ নিত, যা স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছিল।
শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদান:
শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তেওতা একাডেমি, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সে সময় মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুর্ব বাংলায় বেশ পরিচিতি লাভ করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে লেখাপড়া করতো। এদের জন্য বিশাল ছাত্রাবাসও ছিলো।
#ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব আয়োজনেও জমিদাররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। দোল পূজা ও কালী পূজা ব্যাপক জনসম্পৃক্ততায় আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপিত হতো।
#সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত:
ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রজাবান্ধব জমিদার হিসেবে কিরণ সংকর রায় ও হেমসংকর রায় হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এ বিষয়ে তেওতা একাডেমির সাবেক শিক্ষক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় অজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকেও এ তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
যে ভুল ধারণাগুলো ছড়ানো হচ্ছে;
জমিদারি প্রথায় নির্দিষ্ট এলাকার শাসনভার তাদের ওপর ন্যস্ত ছিল। সে কারণে গারদখানা বা কারাগারের ব্যবস্থা রাখা স্বাভাবিক ছিল। এক ভবন থেকে অন্য ভবনে আন্ডারগ্রাউন্ড পথ থাকা তাদের নিরাপত্তার অংশ হতে পারে।
কথিত কূপ কী কাজে ব্যবহৃত হতো—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এটাও বলা যায় না যে সবকিছুই ইতিবাচক ছিল। জমিদারি টিকিয়ে রাখতে বিদ্রোহ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে বিভিন্ন কৌশল বা কঠোরতা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
#বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যাশা:
তেওতা জমিদার বাড়ি বর্তমানে অনেকটাই জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর অবস্থায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে উত্তর দিকের ভবনে সামান্য কিছু কাজ করা হয়েছে। এছাড়া নবরত্ন ভবনটি বহুদিন আগে রং করা ছাড়া তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বর্তমানে পুরো বাড়িটি অরক্ষিত। সন্ধ্যার পর এটি মাদকাসক্তদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে।বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর দেওয়া উচিত। পাশাপাশি
এখন উপজেলা প্রশাসন যদি সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করে বিলবোর্ড বা তথ্যফলকের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে, তবে তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে।
আশার কথা:
বর্তমান স্থানীয় সাংসদ এসএ জিন্নাহ কবির জিন্নাহ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজ খানম রিতা জমিদার বাড়িটি সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন
লেখক- সাংবাদিক, বৈশাখী টেলিভিশন ও কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি।

