মঙ্গলবার

৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আমরা কি পুরোনো সিস্টেম থেকে বের হতে পারছি

🕙 প্রকাশিত : ৭ এপ্রিল, ২০২৬ । ৩:০৮ অপরাহ্ণ

প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে নদী ও সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়—বিশেষ করে মা ইলিশ রক্ষা ও প্রজনন বাড়ানোর জন্য। এই সময় জেলেরা আয় করতে পারে না, তাই তাদের সহায়তার জন্য সরকার বছরে চারবার ৪০ কেজি করে চাল দেয়।

আমরা যেহেতু মানিকগঞ্জ জেলার বাসিন্দা, সে ক্ষেত্রে আমাদের জেলার বিশাল অংশজুড়ে বয়ে গেছে পদ্মা-যমুনা নদী।

মূল কথা—
যেসব জেলে নদীতে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাই মূলত নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ না ধরার শর্তে সরকারি চালের সহায়তা পাওয়ার কথা। তবে যারা খাল-বিল কিংবা পুকুরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা এই সুবিধার আওতায় থাকার কথা নয়।
উপজেলা মৎস্য অফিস সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় প্রথমে জেলেদের তালিকা তৈরি করে। পরে এসব জেলেদের একটি করে জেলে কার্ড দেওয়া হয়।

এখন আসি এ বিষয়ে উপজেলার একটি ইউনিয়নের বর্তমান চিত্রে। তেওতা ইউনিয়নের বিশাল একটি অংশজুড়ে যমুনা নদী বয়ে যাওয়ায় এই নদীকে ঘিরে চরাঞ্চলের অনেক মানুষ জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ থাকার কথা থাকলেও, দেখা যায়—এদের অনেকেই এক মাস আগে থেকেই নৌকা, জাল কেনাসহ নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ ধরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকে।

প্রাপ্ত তথ্য মিলিয়ে নিলে দেখা যাবে, যেসব জেলেদের প্রশাসন জরিমানা বা শাস্তি দেয়, তারাই মূলত মৌসুমি জেলে হিসেবে জেলে কার্ডের চালের সুবিধা নিয়ে থাকে।

এখন আসি ইউনিয়নের এই পাড়ের চিত্রে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা জীবনে নদীতে মাছ ধরা তো দূরের কথা, ন্যূনতম পুকুরেও মাছ ধরেননি—তাদের তথ্যও নেই। তারপরও তারা জেলে কার্ডধারী হিসেবে সরকারি চাল নিচ্ছেন।

বিতরণ প্রক্রিয়া— ইউনিয়নের এবার মোট ১,৭০০ কার্ডধারী জেলে রয়েছে। গত কয়েক মাস আগে কার্ডধারীদের ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চার ধাপে মোট এক হাজার জেলের চাল পাওয়ার কথা রয়েছে।

কার্ড বিতরণের চিত্র তুলে ধরলে দেখা যায়—৯টি ওয়ার্ডের ৯ জন সদস্য ও ৩ জন মহিলা সদস্য মিলে মোট ৪০০টি জেলে কার্ড বিতরণ করেন। চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকে ১০০টি কার্ড। বাকি ৫০০টি কার্ড দলীয়ভাবে বিতরণ করা হয়।
চেয়ারম্যানের বরাদ্দকৃত কার্ডের মধ্যেও উপজেলার কর্তা ব্যক্তিদের অনুরোধে কিছু নির্দিষ্ট কার্ড দিতে হয়। বাকি কার্ডগুলো, যেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা নন, সে কারণে তিনি তার আজ্ঞাবহ ঘনিষ্ঠ লোকজনের মাধ্যমে পছন্দমতো বিতরণ করেন।

অন্যদিকে, বাকি ৫০০ কার্ড সরকারদলীয় লোকজনের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। পুরো সিস্টেমটিই বিগত সরকারের আমলের
বিতরণ কাঠামোয় রয়ে গেছে। যা প্রকৃতপক্ষে নীতিমালা অনুযায়ী নয়।

দলীয়ভাবে কার্ড বিতরণের সময় তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি তাদের পছন্দের লোকদের হাতে এসব কার্ড তুলে দেন। দলীয় অনেকেই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত জেলেরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে জেলে না হয়েও কার্ডধারীরা চাল পাচ্ছেন। এমনকি কিছু অসাধু ব্যক্তি অন্যের কার্ড ব্যবহার করে চাল তুলে কালোবাজারে বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। কয়েকদিন আগে একটি বাড়িতে চাল বিক্রির ঘটনাও সামনে এসেছে।

পুনশ্চ—
এই জেলে কার্ড ভিত্তিক চাল বিতরণ ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত জেলেদের একটি বড় অংশ বঞ্চিত হচ্ছে। যেহেতু কার্ড ছাড়া কাগজে-কলমে এই চাল পাওয়ার সুযোগ নেই, তাই অযোগ্য ব্যক্তিদের কার্ড ব্যবহার করে অসাধু চক্র অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। আর যাদের জন্য সরকার এই চাল বরাদ্দ দেয়, তাদের অনেকেই বাস্তবে ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকছেন না।
অপর দিকে দলীয় লোকজন যদি এসব কার্ড বিতরণ না করে মনিটরিং করে সে ক্ষেত্রে সচ্ছলতা ফিরে আসবে বলে স্থানীয়দের মত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপজেলা মৎস অফিস এ কার্ড গুলো যাচাই-বাছাই না করে চুরান্ত করেছে সেক্ষেত্রে তাদের বড় ভুমিকা রয়েছে অসচ্ছতার জন্য। কোন ভাবেই তারা এর দায় এড়াতে পারে না বলে সচেতন মহল মনে করেন।

লেখক: মারুফ হোসেন,
সাংবাদিক -লেখক, বৈশাখী টেলিভিশন ও কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ