টিকা সংকটের ঝুঁকি নিয়ে গত বছরই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু যাদের উদ্দেশে এমন সম্পাদকীয় লেখা হয়, তারা আদৌ তা গুরুত্ব দিয়ে পড়েন কি না—এই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় মতামতকে প্রায়ই গুরুত্বহীন মনে করা হয়, যদিও উন্নত দেশগুলোতে নীতিনির্ধারণে এসব লেখার প্রভাব স্পষ্ট। রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবতায় সেই গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
এরই প্রেক্ষাপটে দেশে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সহস্রাধিক শিশু। অথচ ২০২৫ সালের ১০ মার্চ প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে ‘শিশুদের টিকা সংকটের বিপদ অনেক’ শিরোনামে স্পষ্ট করে সতর্ক করা হয়েছিল—টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটলে অর্জিত সাফল্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শিশুস্বাস্থ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। একসময় যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ শিশু সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত, সেখানে টিকাদান কর্মসূচির ফলে সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, টিকার ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই অর্জন বিপন্ন হতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে টিকার সরবরাহে বিলম্বের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, যশোর, ঝিনাইদহসহ ৩০টিরও বেশি জেলায় পিসিভি, আইপিভি, পেন্টাভ্যালেন্ট ও এমআরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক নির্ধারিত সময়ে টিকা দিতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন, ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—সরকারি অপারেশনাল প্ল্যান বাস্তবায়নে বিলম্ব, টিকা পরিবহনে প্রয়োজনীয় যানবাহন ও জনবলের ঘাটতি এবং গ্যাভি ও কোভ্যাক্সের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সরবরাহ কমে যাওয়া। এসব কারণে সময়মতো টিকা বিতরণ ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে অনিয়ম বা দীর্ঘসূত্রতা সংক্রামক রোগের পুনরুত্থানের বড় কারণ হতে পারে। অতীতে চট্টগ্রামে সময়মতো টিকা না দেওয়ায় হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার উদাহরণও রয়েছে।
সুতরাং, টিকা সংকট অব্যাহত থাকলে তা শুধু শিশুদের নয়, পুরো জনস্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ইপিআই কর্মসূচির মতো একটি সফল উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

