গ্যাস সংকট দেশের সিরামিকশিল্পের সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু গ্যাসের অভাবে সিরামিক খাতের উৎপাদন ক্ষমতার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে। ঢাকার অদূরে সাভার ও ধামরাই অঞ্চলের সিরামিক কারখানাগুলো ব্যাপক গ্যাস সংকটে ভুগছে। উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার না হওয়ার পাশাপাশি খরচও বাড়ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সিরামিক খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, এ খাত সংকটে পড়লে সিরামিক পণ্য আমদানি বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে চাপে ফেলবে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের সমাধান হলে উল্টো আগামী পাঁচ থেকে ছয় বছরে সিরামিক পণ্য রপ্তানি করে বছরে এক বিলিয়ন ডলার দেশের জন্য আয় করে আনতে পারবে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) মহাসচিব ইরফান উদ্দিন সমকালকে বলেন, দেশীয় সিরামিকশিল্প চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি পূরণ করায় বছরে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হচ্ছে। এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে চাহিদা মেটাতে দেশকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করতে হবে।
সিরামিক খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, চাপ কমে যাওয়া এবং আকস্মিক গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমার আগাম সতর্কতা না থাকায় শত শত কোটি টাকার কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানি সংকট রপ্তানি আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। কারণ ক্রেতারা যখন দেখেন, গ্যাস সংকটে কোম্পানিগুলো সময়মতো পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা হারাচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবে ক্রয় আদেশ দিতে চায় না।
গ্যাস সিরামিকশিল্পের ‘রক্ত’
সিরামিক পণ্য কাঁচামাল ছাড়া হয় না। তবে কাঁচামাল থাকলেই পণ্য উৎপাদন হবে না, যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া যায়। এ খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো– কাঁচামাল পোড়ানো, গ্লেজিং, শুকানো এবং পণ্যে দৃঢ়তা আনা। এর সবকিছুই নির্ভর করে ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহের ওপর। আধুনিক সিরামিক উৎপাদনে কিলন বা চুল্লি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রাখতে হয়। একবার কিলন বন্ধ হলে শুধু উৎপাদনই বন্ধ হয় না; কাঁচামাল নষ্ট হয়, যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয় এবং কিলনকে আবার চালু করতেও বাড়তি ব্যয় লাগে।
বিসিএমইএর মহাসচিব জানান, ‘এটি ঠিক যে, গ্যাসের সংকট একটি জাতীয় সমস্যা। তবে আমরা যারা এ শিল্পে এরই মধ্যে বিনিয়োগ করেছি, তারা এখন উভয় সংকটে। অতিরিক্ত দাম দিয়েও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছি না। কখনও সকাল ৮টায় গ্যাসের চাপ থাকে না, কখনও দুপুরে বা বিকেলে। এভাবে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত, কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে এবং পরিচালন খরচ বাড়ছে।’
অনেক কারখানার উৎপাদন কমেছে
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) জানিয়েছে, বর্তমানে ৬০টির বেশি মাঝারি ও বড় কারখানার উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার হচ্ছে। বাস্তবে অনেক কারখানা এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
প্রতীক সিরামিকের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের কারখানা ধামরাইতে। যেখানে ৪০ শতাংশ গ্যাস কম পাওয়ায় সিএনজি আকারে কিনে উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে। শুধু রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণের জন্য বাড়তি খরচ হচ্ছে। উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে মুনাফার প্রায় পুরোটা খেয়ে ফেলছে গ্যাসের সংকট। সিরামিকশিল্প সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করে। এর মধ্যে রয়েছে–কারখানার শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন শ্রমিক, প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান, শোরুমকর্মী। উৎপাদন কমায় এসব খাতে আয় কমছে, অতিরিক্ত ওভারটাইম বন্ধ হয়েছে, অনেক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেছেন, গ্যাস সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি হবে।

কেন এই সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছে। এতে দেশে গ্যাস উৎপাদন কমছে, এলএনজি আমদানি ব্যয়বহুল, সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ছিল। গ্যাসের অতিরিক্ত দাম দেওয়ার পর গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ, উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির মতো বৈদেশিক মুদ্রা সরকারের হাতে ছিল না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার নিয়মিত এলএনজি আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এখনও সব শিল্পের জন্য সব এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না।
জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি উদ্যোক্তাদের
বিসিএমইএর মহাসচিব ইরফান উদ্দিন বলেন, যারা শিল্পে বিনিয়োগ করেছেন, এখন বাধ্য হয়ে আপৎকালীন বিকল্প ব্যবস্থায় কারখানা চালু রাখছেন। এভাবে দীর্ঘমেয়াদে কোনো শিল্পকেই টিকিয়ে রাখা যাবে না। তিনি বলেন, সরকারকে গ্যাস সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতেই হবে। তবে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি কী করে ভোলার গ্যাস সাশ্রয়ীভাবে মূল ভূখণ্ডে আনা যায়, সে চিন্তা করতে হবে। আবার দেশে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। অন্যথায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশ যখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করবে, তখন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
সিরামিক খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, সিরামিকশিল্পের অস্তিত্বের প্রশ্ন। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে বহু প্রতিষ্ঠান বাজার হারাবে, কিছু বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তাতে রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনার স্বপ্ন পূরণ হবে না। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে দেশের এ শিল্প ২০৩০ সালে এক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করতে পারবে।

