সেচ মৌসুমের মাঝপথে এসে চরম বিপাকে পড়েছেন মানিকগঞ্জের কৃষকেরা। মাঠে ধান থাকলেও পর্যাপ্ত পানির নিশ্চয়তা নেই। জ্বালানি সংকট ও বাড়তি খরচের কারণে অনেকেই বেশি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ সময়মতো সেচ দিতে না পেরে ফসল নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
এই সংকট নিরসনে আশার আলো হতে পারত সৌরবিদ্যুৎচালিত (সোলার) সেচ পাম্প। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তদারকির ঘাটতিতে কোটি টাকার এসব প্রকল্প কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। জেলার অধিকাংশ সোলার ইরিগেশন প্রকল্পই এখন অচল বা আংশিক সচল অবস্থায় রয়েছে। কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি, কোথাও আবার টেকনিশিয়ানের অভাবে বন্ধ রয়েছে পাম্পগুলো।
জানা গেছে, ২০১৬ ও ২০২১ সালে দুই দফায় পরিবেশবান্ধব এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। জেলায় দুটি প্রকল্পের আওতায় মোট সাতটি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি নিয়মিত সচল, দুটি আংশিক সচল এবং বাকিগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জে প্রায় ৯ হাজার বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প রয়েছে, যেগুলোর জন্য ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি ২১ হাজার ২২৩টি ডিজেলচালিত পাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৮৫ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। সোলার পাম্পগুলো কার্যকর থাকলে এই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২১-২২ অর্থবছরে বৃহত্তর ঢাকা জেলা সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঘিওর উপজেলার চর ঘিওর এলাকায় প্রায় ২০ লাখ ৬৬ হাজার টাকায় একটি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করে বিএডিসি। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৭০ বিঘা জমিতে বিনামূল্যে সেচ দেওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছরেও সেটি চালু হয়নি। বর্তমানে এটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষিজমিতে পাইপ বসানো থাকলেও সেখান থেকে কোনো পানি সরবরাহ হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “সোলার পাম্প কোনো কাজে আসছে না। এখন বিদ্যুৎচালিত মোটর দিয়ে নিজের জমিসহ অন্যদের জমিতেও সেচ দিচ্ছি। ডিজেলের দাম বেশি, পাওয়া কঠিন।”
এদিকে সিঙ্গাইর উপজেলার রসুলপুরে ২০১৬ সালে স্থাপিত আরেকটি সোলার পাম্পও বর্তমানে অচল। সোলার প্যানেল চুরি হয়ে যাওয়ার পর আর মেরামত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষক ইয়াকুব আলী।
তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত কিছু সোলার পাম্প সফলতার মুখ দেখছে। জয়মন্টপ ইউনিয়নের কৃষক ওহাব খান ১৫টি সোলার প্যানেল দিয়ে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে সেচ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “ডিজেল ও বিদ্যুতের তুলনায় খরচ অনেক কম। সরকারি সহায়তা পেলে আরও পাম্প স্থাপন সম্ভব।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সোলার পাম্প কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এতে ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং পরিবেশ সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে।
মানিকগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন কমিটির সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম বলেন, “রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সোলার পাম্পগুলো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, অথচ খরচ কমানো ও পরিবেশ রক্ষায় এর বিকল্প নেই।”
বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী তিতাস জানান, পাম্প স্থাপনের পর এক বছর পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণ করে, এরপর সমস্যা হলে কৃষকদেরই উদ্যোগ নিতে হয়। বন্ধ পাম্পগুলো চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, সোলার সেচব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জোরদার করা হবে। অচল পাম্পগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

