এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা কেমনে আইলো বাটে
আঙ্গিনার মাঝে বঁধুয়া ভিজিছে
দেখিয়া পরান ফাটে
বৈষ্ণব পদাবলীর কবি চণ্ডীদাসের এ পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বর্ষার হৃদয়সিক্ত আর্দ্ররূপ সহজেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য যেমন প্রকৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তেমনি কবিতায়ও এনেছে ভিন্নস্বাদ। একেকটি ঋতু একেক রূপ, রস, গন্ধ নিয়ে ধরা দেয়। তবে বর্ষার বৈশিষ্ট্য খুব সহজেই চোখে পড়ে। বর্ষা একদিকে যেমন রুদ্র প্রকৃতিকে জলসিক্ত করে খরা ও দাবদাহ থেকে মুক্তি দেয়, মৃত্তিকাকে করে তোলে সৃষ্টিমুখর; অন্যদিকে মানুষের মনোজগতেও বর্ষার প্রভাব অবিসংবাদী। বর্ষণমুখর পরিবেশ মানুষের মনকে করে বেদনার্ত ও স্মৃতি ভারাতুর। বর্ষা বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব প্রতিনিধিত্বশীল কবিকেই আলোড়িত করেছে। ফলে বাংলা কবিতাও হয়ে উঠেছে বৃষ্টিমুখর।
মেঘদূত কাব্যে কবি কালিদাস শাপগ্রস্ত যক্ষের স্ত্রীর প্রতি প্রেমানুভূতি তুলে ধরেছিলেন মেঘকে দূত রূপে হাজির করার মধ্য দিয়ে। কর্তব্যে অবহেলার কারণে দেবতার কোপানলে পড়ে এক বছরের জন্য রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত যক্ষ স্ত্রীর বিরহে আকুল হয়ে বর্ষার মেঘকে দূত করে স্ত্রীর কাছে প্রেমবার্তা প্রেরণ করেন-
প্রত্যাসন্নে নভসি দয়িতাজীবিতালম্বনার্থাং
জীমূতেন স্বকুশলময়ীং হারয়িষ্য প্রবৃত্তিম।
অর্থাৎ, কেমনে প্রিয়তমা রাখবে প্রাণ তার অদূরে উদ্যত শ্রাবণে
যদি-না জলধরে বাহন করে আমি পাঠাই মঙ্গল-বার্তা (অনুবাদ: বুদ্ধদেব বসু)
বাংলা কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্ষার এ অন্তরঙ্গ সুর বেজে চলেছে সুদীর্ঘ কাল ধরে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বর্ষায় প্রকৃতির রূপ ও মানব-মানবীর মনে বর্ষার বিশেষ প্রভাবের দিকটি তুলে ধরেছেন ‘বর্ষাকাল’ কবিতায়-‘গভীর গর্জ্জন সদা করে জলধর/উথলিল নদনদী ধরণী উপর/রমণী রমণ লয়ে, সুখে কেলি করে/দানবাদি দেব, যক্ষ সুখিত অন্তরে।’ রবীন্দ্রকাব্যে বর্ষা অভূতপূর্ব নান্দনিক বিভায় উজ্জীবিত। ‘সোনার তরী’ কবিতায় বর্ষা বাংলার চিরায়ত রূপে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কবিতার অন্তর্নিহিত দার্শনিক অভিব্যক্তি ছাপিয়ে এখানে নদীমাতৃক কৃষিজীবী বাংলার অনন্য রূপ ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে-গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা/কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা/রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা/ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা-/কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা। কিংবা ‘আষাঢ়’ কবিতায় তিনি বর্ষার চিরাচরিত রূপ ধারণ করেছেন চিত্রশিল্পীর দক্ষতায়-বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর/আউশের খেত জলে ভর-ভর/কালী মাখা মেঘে ওপারে আঁধার/ঘনিয়েছে দেখ চাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বর্ষা প্রেম, বিরহ, বিদ্রোহ ও বিষাদের মিশ্রানুভূতির দোলা নিয়ে হাজির হয়েছে-
ব্যাকুল বনরাজি শ্বসিছে ক্ষণে ক্ষণে
সজনি মন আজি গুমরে মনে মনে
বিদরে হিয়া মম/বিদেশে প্রিয়তম
এ-জনু পাখিসম/বরিষা জর জর।।
বৈষ্ণব পদাবলির বিদ্যাপতির রাধার বিরহ বেদনা চকিতে চমক দিয়ে ওঠে উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিগুলোতে-
‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর’
বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতিতে বর্ষার রুদ্র ও রোমান্টিক রূপ দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি জসীমউদ্দীন। পল্লিজীবনের প্রসন্ন রূপকার জসীমউদ্দীন গ্রামীণ জনজীবনের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন কবিতায়। ‘পল্লী বর্ষা’ কবিতায় তিনি বর্ষায় গ্রামীণ মানুষের অন্তর ও অন্দরমহলের প্রকৃত রূপ চিত্রিত করেছেন। বৃষ্টির দিনে হিজলের বন, কদমের রেণু ঝরার দৃশ্য যেমন এখানে দৃশ্যমান, তেমনি বাদলের সময় গ্রামের মানুষের গল্প-গুজব ও নানা ধরনের গান-বাজনায় মেতে ওঠার চমৎকার চিত্রও লক্ষণীয়। এ সময় কেউ বাঁশের লাঠিতে ফুল তোলে, কেউ সারিন্দা বানায়, কেউ রশি পাকায় আর কেউবা আমির সাধুর কাহিনি বলে যায় করুণ সুরে। গ্রামের নারীরাও এ সময় নানাবিধ সৃজনশীল কাজে মগ্ন থাকে। কবির ভাষায়-
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রশি
সমুদ্রকলি শিকা বানাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপ্নখানি
তারে ভাষা দেয় দীঘল সুতার মায়াবি আখর টানি।
জীবননান্দ দাশের কবিতায়ও বর্ষা তার চিরন্তন ছাপ রেখে গেছে সাবলীল ভঙ্গিমায়। বাংলার রূপমুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশ বৃষ্টির ছবি আঁকার ক্ষেত্রেও রেখেছেন স্বকীয়তার স্বাক্ষর। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের ‘কেমন বৃষ্টি ঝরে’ কবিতায় সোনালি চিল, ঘাস, ছেঁড়া ময়লা মেঘ, হাজার যুগ আগে প্রভৃতি স্বকীয় শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে বৃষ্টির ছন্দকে ধারণ করেছেন কবিতার ক্যানভাসে-
কেমন বৃষ্টি ঝরে-মধুর বৃষ্টি ঝরে-ঘাসে যে বৃষ্টি ঝরে-রোদে যে বৃষ্টি ঝরে আজ…
আকাশে এমন ছেঁড়া ময়লা মেঘের রাশ-পড়েছে তাদের ছায়া নীলের ঘোলা জলে নিঝুম পিরামিডে
আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় বর্ষা চিত্রণে নতুনত্ব যোগ করেছেন। বৃষ্টিকে প্রাকৃতিক ঘটনার পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক মহিমায়ও অভিষিক্ত করেছেন। ফলে বর্ষা তার কবিতায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের প্রতীকী তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে-
‘ফেব্রুয়রির একুশ তারিখ
দুপুরবেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায়
বরকতেরই রক্ত।’
বৃষ্টি আল মাহমুদের কবিতায় প্রণয়ের স্নিগ্ধ অনুভূতির দ্যোতনা তৈরি করে আবেগের সততায়-
‘সকালে ঘুম থেকে জেগেই মনে হলো আজকের এই বৃষ্টিটা তোমার জন্য।’
শামসুর রাহমান নাগরিক বিষাদ ও বিবমিষা তুমুল বর্ষায় ধুয়ে দিতে চেয়েছেন। ‘তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন’ কাব্যগ্রন্থের ‘এমন বর্ষার দিনে’ কবিতায় কবি প্রেয়সীর মনকে আষাঢ় আর হৃদয়কে শ্রাবণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। কবি মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেন প্রিয়তমার আঠারো বছর বয়সকে বৃষ্টি চুমো খাচ্ছে। আধুনিক মানবীও বৈষ্ণব পদাবলির রাধা ডাক টেলিফোনে শোনার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল এ কবিতায়-‘এমন বর্ষার দিনে তোমার কি সাধ জাগে কেউ/নিরিবিলি টেলিফোনে রাধা বলে ডাকুক তোমাকে?’
আবুল হাসান বৃষ্টিকে দেখেছেন আবেগ ও বাস্তবতার এক অনন্য উচ্চতা থেকে। ‘বৃষ্টি চিহ্নিত ভালোবাসা’ কবিতায় স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে প্রিয় মানবীর সঙ্গে কাটানো দারুণ বৃষ্টিময় মুহূর্তের অপূর্ব চিত্র খোদিত হয়েছে। বৃষ্টির বিধ্বংসী রূপের মধ্য দিয়ে রোমান্টিক অনুভবের ব্যতিক্রমী রূপায়ণ কবিতাটিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। কবিতাটি শুরু হয়েছে চমকপ্রদ স্মৃতির সলতে উসকে দিয়ে-মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল? এরপরই বৃষ্টির জলডাকাত রূপের ছবি এঁকেছেন কবি। বৃষ্টির সময় চাখোরদের চায়ের পিপাসা, উঠতি শিল্পীদের গানচর্চা, অভাবীদের বৃষ্টি বিড়ম্বনা কিংবা রোগীদের যন্ত্রণার দৃশ্য এখানে শৈল্পিক ভারসাম্যে উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে কবি তার লক্ষ্যবিন্দুতে স্থির দৃষ্টি রাখতে ভোলেননি-
সেদিন বৃষ্টিতে কিছু আসে যায়নি আমাদের
কেননা সেদিন সারাদিন বৃষ্টি পড়েছিল
সারাদিন আকাশের অন্ধকার বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে
আমাদের পাশাপাশি শুয়ে থাকতে হয়েছিল সারাদিন
বাংলা কবিতায় বৃষ্টির ধাতব নাগরিক মূর্তি চিত্রিত করেছেন কবি শহীদ কাদরী। উত্তরাধিকার কাব্যগ্রন্থের বৃষ্টি, ‘বৃষ্টি’ কবিতায় বর্ষা ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। বৃষ্টির এমন লৌহকঠিন রূপ আগে কখনো দেখেনি বাংলা কবিতা। একেবারে অপরিচিত ও অভিনব শহীদ কাদরীর বৃষ্টিমূর্তি। কবিতাটি শুরু হয়েছে বৃষ্টিকে সন্ত্রাসের সঙ্গে তুলনা করে। বৃষ্টির তুমুল শব্দের মধ্যে তিনি দেখেছেন লক্ষ লেদ মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন। শহরের জানু, চকচকে এভিনিউ। কবির ভাষায়-
বজ্র শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি: শ্রুতিকে বধির করে
গর্জে ওঠে যেন অবিরল করাত কলের চাকা
লক্ষ লেদ মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন!
বৃষ্টিতে রাজপথে বাউন্ডলে, উন্মূল, উদ্বাস্তু, ভিক্ষুক, চোর আর অর্ধ উন্মাদের রাজত্বের দিকটিও তার কবিতায় দৃশ্যমান।
কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ জ্যোৎস্না ও বর্ষাপ্রেমের তুমুল স্বাক্ষর রেখেছেন তার সৃষ্টিকর্মে। তার ভেতরে এক সত্যিকার গীতিকবির মন সহজেই লক্ষযোগ্য। ‘যদি মন কাঁদে/তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়। তার জনপ্রিয় একটি গীতিকবিতা।
বাংলা কবিতায় বর্ষার প্রভাব ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। সূচনালগ্ন থেকে অদ্যাবধি বাংলা কবিতার প্রায় সব প্রধান কবি বর্ষাযাপন করেছেন তাদের স্বকীয় ভঙ্গিমায়। তবে বর্ষাকে সব কবিই যে রোমান্টিক দৃষ্টিতে চিত্রিত করেছেন, এমনটি নয়। বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অগ্নিগর্ভ মুহূর্তও বৃষ্টি ও বর্ষার আবহে ধারণ করেছে বাংলা কবিতা।

