প্রবীণ সম্পাদক শফিক রেহমান বলেছেন, সাংবাদিকতা শুধু চাকরি নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, যেখানে স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এ এ কথা বলেন শফিক রেহমান। আজ শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের (কেআইবি) মিলনায়তনে যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ।
সাংবাদিকদের বিকল্প পেশাগত দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিয়ে শফিক রেহমান বলেন, শুধু সাংবাদিকতার ওপর নির্ভর করলে একদিন না একদিন আপসের ফাঁদে পড়তে হবে। সে জন্য শিক্ষকতা, গবেষণা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের আহ্বানও তুলে ধরেন তিনি।
সাংবাদিকদের ‘দালাল বলা’ হলে তার দুঃখবোধ হয় জানিয়ে প্রবীণ এই সম্পাদক বলেন, ‘বলবে না কেন? যারা ছিল কয়দিন আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে, তারা হয়ে গেল সব এখন বিএনপির পক্ষে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার না কি? এটা ম্যাজিক। এই ম্যাজিক কেন? আপনারা পাল্লায় পড়েছেন? এই ম্যাজিকে আপনি পড়বেন না। সুতরাং এতে আপনার সম্মান বাড়ছে না।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রবীণ এই সম্পাদক বলেন, সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে পূর্ণ মর্যাদার পেশা হয়ে ওঠেনি। তবে এই মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই। তার প্রস্তাব, পত্রিকার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড কমিটি গঠনের, যা সম্পাদনা ও পেশাগত নীতিমালার মান নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘ বক্তব্যে শফিক রেহমান বলেন, নামের আগে বিশেষণ ব্যবহার তিনি বরাবরই অপছন্দ করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিকে নয়, প্রতিষ্ঠানের কাজকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শফিক রেহমান বলেন, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে দেশ ছাড়তে হয় এবং দীর্ঘ সময় নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। লন্ডনে প্রায় ২৯ বছর অবস্থানকালে তিনি ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও সম্প্রচারজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে তিনি সচেতনভাবে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলেছেন বলে জানান।
সাংবাদিকতার ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকাশক, সম্পাদক ও লেখকের দায়িত্ব আলাদা করে তুলে ধরেন শফিক রেহমান। তার মতে, লেখকের প্রধান কাজ চিন্তা করে লেখা, ক্ষমতার সঙ্গে আপস নয়। তিনি বক্তা নন, লেখক হতে চেয়েছিলেন এবং আজও তা–ই হতে চান।
নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে শফিক রেহমান বলেন, জেলখানায় যাওয়ার পরে আমি আমার বাম চোখ হারিয়েছি, বাম কান হারিয়েছি। ডান কানে খুব কম শুনি এবং ডান চোখে এখন আমি ৫০ শতাংশ দেখছি। আমি কিন্তু কানের মধ্যে মেশিন লাগিয়েই আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি।
তবু এসব প্রতিবন্ধকতা তাকে মতপ্রকাশ থেকে বিরত রাখতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শফিক রেহমান বলেন, দেশের ব্যাংকিং ও মুদ্রানীতিতে দীর্ঘদিনের ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব এখন স্পষ্ট।
তিনি আরও বলেন, মানুষের সোনার দিকে ঝুঁকে পড়া অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার লক্ষণ। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি শক্তিশালী ও মানসম্মত ব্যাংকিং কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
সূত্র:ইত্তেফাক

