ছুটির দিন ছিল বলে ১৬ নভেম্বর আমরা বেলেম ঘুরতে গিয়েছিলাম। জাদুঘর বা সংগ্রহশালার জন্য বেলেম প্রসিদ্ধ নয়। অনেকেই প্রেসেপিও দুর্গ ঘুরতে যান। গুয়ামা নদী ও প্যারানা গুয়াকোর তীরে ১৬১৬ সালে এই পর্তুগিজ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। টুপিনাম্বা বিদ্রোহে এই দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পর্তুগিজ ঔপনিবেশিকতা ক্রমেই বন্দী করে আমাজন।
‘মিউজিয়াম অব আর্ট অব বেলেম’, ন্যাশনাল মিউজিয়াম কিংবা ‘মিউজো দ্যস আমাজোনিয়াসে’ কপে আসা দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেল।
জলবায়ু সম্মেলন উপলক্ষে বেলেমের ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাজন বন সুরক্ষার আকুতি নিয়ে ‘টেরা ইনকগনিটা’ শিরোনামে চলছে ৬০ শিল্পীর প্রদর্শনী। প্রদর্শনী শেষ করে প্রাচীন কিছু গির্জা দেখে আমরা গেলাম ‘জুওবোটানিক্যাল গার্ডেনে’। ১৮৬৬ সালে শুরু হওয়া আমাজন অঞ্চলের প্রাকৃতিক ইতিহাস ও এথনোগ্রাফির প্রথম উদ্যান এটি। গাছগাছালি, অ্যানাকোন্ডা, আর্মাডিল্লো, জাগুয়ার, কচ্ছপ, মাছ, পাখি, আমাজন লিলি নিয়ে এক টুকরা ছোট্ট আমাজন বনের নমুনা এই উদ্যান।
নদীতীরের কাদায় ও উদ্যানের গাছে উরুবাস বা কালো শকুনের ঝাঁক দেখা গেল। ময়লা-আবর্জনা খেয়ে এরা বেলেম শহর পরিচ্ছন্ন রাখে। প্রাণিসম্পদের জন্য ডাইক্লোফেনাক ব্যবহার করে বাংলাদেশে শকুন হত্যা করা হয়েছে। যদিও পরে সেসব নিষিদ্ধ করে সরকার। বন্য প্রাণীদের সরিয়ে রেখে এনডিসি, অভিযোজন, রূপান্তর বা অর্থায়নের প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না। কাউকেই জলবায়ু দেনদরবার মঞ্চের বাইরে রাখা যাবে না, সবার জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে।
বেলেম শহরের নগর স্থাপত্য, খাদ্য, বাজার, ভাষা কী পোশাকে ঔপনিবেশিকতার দাগ লেগে আছে। তবে স্থানীয় বাজারগুলোতে আমাজন বনের একটা বিউপনিবেশিক ঝাঁজ পাওয়া যায়। ভেরো-পেসোর জমজমাট বাজারে আমাজনের বিখ্যাত ফিলোটি, টুকুনারি, পিরানহা মাছদের দেখা গেল। পিরারুকু মাছের পাতি বিক্রি হয়। স্থানীয় বাজারে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি আমাজন অঞ্চলের হস্তশিল্প বিক্রি হয়।
আমাজনের তালজাতীয় গাছের এক পাকা ফলের ক্বাথ থেকে তৈরি আসাইয়ে খাবারটি এখানকার সাংস্কৃতিক মহিমা। আখ, তামাক, নীল, রাবার, কফি, চা বা কোকোর মতো আসাইয়েকে ঔপনিবেশিক করা সম্ভব হয়নি। আর এটিই স্থানীয় প্রাণব্যবস্থার দুর্বিনীত শক্তি।
১৬ নভেম্বর আমরা কয়েকজন রাস্তার ধারের এক রেস্তোরাঁয় খেতে বসেছিলাম। পরিচয় হলো বেলেমের নাগরিক এডিলেড কোরিয়া ও তাঁর স্বামী আদ্রিয়ানো ফ্রাংকো গঞ্জালেসের সঙ্গে। আদ্রিয়ানো একটি আসাইয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানিতে কাজ করেন। মাসে ১ হাজার ৫০০ ব্রাজিলিয়ান রিয়েল বেতন পান (১ রিয়েল= ২৫ টাকা)।
জলবায়ু সম্মেলন বিষয়ে তাঁরা অবগত, গ্রিন জোন থেকে ঘুরে আসবেন শিগগিরই। কুইয়া নামের কালো পাত্রে আমাদের জন্য আসাইয়ে অর্ডার করলেন তাঁরা। কালাবাস বা হিগুইয়েরা গাছের ফলের খোলস থেকে কুইয়া পাত্রটি বানানো হয়। বাংলাদেশে এটি ডুগডুগি, একতারা, বিলাতি বেল বা জুম্মো মাকাল নামে পরিচিত। মাছ, মাংস, ভাত, সবজি, ফল—যেকোনো কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে বা এক চিমটি চিনি মিশিয়ে আসাইয়ে খাওয়া হয়।
এডিলেড তাঁদের বাসায় নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। বললেন, নভেম্বর থেকেই আসাইয়ে আহরণ শুরু হয়। কিন্তু উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনের পরিবর্তন আসাইয়ে উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। ১৭ নভেম্বর সম্মেলনের গ্রিন জোনে ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ডো আলকমিন আমাজন বন ও আদিবাসীদের জীবিকা সুরক্ষায় ‘কুওপারা+আমাজনিয়া প্রোগাম’ নামে ১০৭ মিলিয়ন ব্রাজিলিয়ান রিয়েলের একটি তহবিল ঘোষণা দেন। আসাইয়েসহ ব্রাজিল বাদাম, বাবাস্যু, কুপুয়াকো ফলের ভেল্যুচেইন বাড়াতে এই তহবিল ব্যয় হবে।
কাঠামোগত বঞ্চনাসহ জলবায়ু সংকটের কারণেও বাংলাদেশের নাটোরের কাঁচাগোল্লা, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, বগুড়ার দই, সিলেটের সাতকড়া, নরসিংদীর লটকন, ভোলার মহিষের দই, শেরপুরের পোড়াবিন্নি বা তুলসীমালা ধান কিংবা মুক্তাগাছার মণ্ডার মতো সাংস্কৃতিক মহিমাগুলো ঝুঁকিতে আছে। কেবল ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই)’ হিসেবে নিবন্ধন করলেই হবে না, জাতীয় জলবায়ু কর্মকৌশল প্রক্রিয়ায় সব জিআইয়ের সুরক্ষা ও বিকাশে স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ প্রতিবেশব্যবস্থা, পবিত্র বন, স্মারক বৃক্ষ, এনডেমিক প্রজাতি (প্রাকৃতিকভাবে যা কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেই জন্মে) কিংবা জিআই নিয়ে কোনো আলাপ-বাহাস নেই সম্মেলনে।
ধর্মীয় নেতারা জলবায়ু নিয়ে কী ভাবেন
পৃথিবীতে বিরাজমান প্রতিটি পুস্তককেন্দ্রিক বা পুস্তকবিহীন ধর্মই প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় করণীয় উচ্চারণ করেছে। জাতিসংঘের ন্যায়বিচার, শান্তি ও স্থায়িত্বশীলতাবিষয়ক সংস্থা ‘কোয়াকার ইউনাইটেড নেশনস অফিসের’ প্রতিনিধি ১১ নভেম্বর ‘ইথিকস অ্যান্ড ফেইথ ট্রান্সফর্মিং কমিউনিটি: ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যাকশন’বিষয়ক এক অধিবেশনে বলেন, বিশ্বের সব ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জলবায়ু ঝুঁকি এবং কণ্ঠস্বরগুলোকে জলবায়ু রাজনীতিতে যুক্ত করা জরুরি।
জলবায়ু সংকটের আঘাত থেকে কোনো জীবন বা ভূগোলই দূরে থাকতে পারছে না। সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রবল প্রভাব থাকলেও ধর্মীয় নেতারা কৃষিজমি দখলকারী, পাহাড়-নদী-বন হত্যাকারী এবং জলবায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন না। মসজিদ, কিয়াং, মন্দির, গির্জা কিংবা মৗঞ্জহি থানেও জলবায়ু আলাপ শুরু হোক।
নদী থেকে বাঁধ, বিদ্যুৎ থেকে কয়লা সরাও
বেলেম সম্মেলনে নদী থেকে বাঁধ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে কয়লা সরানোর দাবি তুলেছেন পরিবেশ ও জলবায়ুকর্মীরা। নিউজিল্যান্ডের একটি জাতিগোষ্ঠীর সদস্য কিয়োকি কিইয়ে উইকি বর্তমানে আমেরিকার নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ার ইয়ুরুক আদিবাসীদের সঙ্গে বসবাস করেন। দ্বৈত জাতিসত্তার পরিচয়দানকারী এই তরুণ নদীকর্মী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে আমেরিকার ক্লামাথ নদীদূষণের বিষয়টি তুলে ধরেন ১৭ নভেম্বর।
১৭ নভেম্বর ব্লুজোনে আয়োজিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পবিষয়ক এক অধিবেশনে আমেরিকার ‘ওয়াটার ক্লাইমেট ট্রাস্টের’ পরিচালক কনরাড ফিশার বলেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে প্রচুর মিথেন গ্যাস নিঃসরণ হয়। একই সঙ্গে এসব প্রকল্প স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে এবং প্রাণবৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটায়। ওই অধিবেশনে ওয়াটারকিপার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী শরীফ জামিল বলেন, কাপ্তাই বাঁধ আদিবাসী জীবন, সংস্কৃতি, পরিবেশ, প্রকৃতি ধ্বংস করেছে। চীন প্রস্তাবিত ৬০ গিগাওয়াটের ব্রহ্মপুত্র বাঁধ বিষয়ে আন্তরাষ্ট্রিক সংলাপ ও সিদ্ধান্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের এক আলোচনা থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে আমেরিকায় কয়লাভিত্তিক শেনানগো কোক প্ল্যান্ট বন্ধ করা হয়েছে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের নানা অসুখের কারণে। ২০০০-২০১৫ সালের ভেতর চীনে ১৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে, যার ফলে ব্রঙ্কাইটিস ও শ্বাসজনিত সমস্যা ও মৃত্যু কমেছে।
শিশুরা যেন ভুল বার্তা না পায়
প্লাস্টিক নয়, টিনের ক্যানে পানি দেওয়া হচ্ছে সম্মেলনে। বাস থেকে নেমে সম্মেলনের নিরাপত্তাতল্লাশি গেট অবধি হাঁটার সময় কিছু ভাঙারিওলাকে দেখা যায়। ময়লাটে পোশাক পরা ১৬ বছর বয়সী দাভির সঙ্গে আলাপ হয় তার বন্ধু কার্লোসের ফোন দিয়ে গুগল অনুবাদের মাধ্যমে। তারা তখন খালি কৌটা পা দিয়ে পিষে বস্তা বোঝাই করছিল। জলবায়ু সম্মেলনের ভাষায় ‘রিসাইকেল বা রিইউজ’। তারা থাকে বেলেমের বারকা বস্তিতে। গ্রামীণ জনপদ থেকে উচ্ছেদ হয়ে জীবিকার তাগিদে শহরে আসতে বাধ্য এমন নগরে দরিদ্রদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। খাদ্য, পানি, ঘর, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নাগরিক অধিকারবঞ্চিত জলবায়ু-উদ্বাস্তু মানুষদের আলাপ জলবায়ুমঞ্চে আনতে হবে।
জলবিদ্যুৎকে বৈশ্বিক সবুজ জ্বালানির সংজ্ঞায় ফেলা যায় না বলে বহুজন প্রমাণ তুলেছেন বেলেম সম্মেলনে। অপর দিকে বাংলাদেশের চতুর্থ শ্রেণির বিজ্ঞান বইতে জলবিদ্যুৎকে ‘নবায়নযোগ্য’ শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ুদুর্গত দক্ষিণ গোলার্ধের শিশুরা কি তাহলে ভুল বার্তা নিয়েই বড় হবে?
বাংলাদেশ থেকে এসেছেন নটর ডেম কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী প্রান্তিক রায়। ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে এক আলাপে তিনি জানান, ঢাকায় বায়ুদূষণ বাড়ছে, রাস্তাঘাটে যাতায়াত করা খুব কষ্টকর, গরমের কারণে স্কুলে ক্লাস করাও কঠিন। শিশু-কিশোরদের জন্য বেলেম সম্মেলন কোনো সুখবর দেবে কি না, তাঁর জানা নেই।
পর্তুগিজ ভাষার কবি ব্রাজিলের ভিনিয়াস ডি মোরায়েসকে অনেকে বলেন ‘দ্য লিটল পোয়েট’। ‘এ পোর্টা’ বা ‘দরজাটি’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে দরজার মতো জীবন্ত আর কিছু নেই।’ ভিনিয়াস লিখেছেন, একেকভাবে দরজা খুললে একেকজন প্রবেশ করে। জলবায়ুমঞ্চের দরজা সবার জন্য শর্তহীনভাবে খোলা রাখা দরকার।

