বৃহস্পতিবার

১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভূমিকম্পের ভয়াল দুর্যোগ প্রতিহতে আমরা কতখানি প্রস্তুত?

🕙 প্রকাশিত : ১ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ৫:১১ পূর্বাহ্ণ

গতকাল সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীকেন্দ্রিক এই ভূকম্পন কেবল কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হইয়াছিল, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই ঢাকার রেলিং, দেওয়াল ও কার্নিশ হইতে ইট-পলেস্তারা ঝরিয়া পড়ে তিন জন পথচারী নিহত হইলেন। রূপগঞ্জে ধসে পড়িল একটি দেওয়াল, মৃত্যু হইল ১০ মাস বয়সি শিশুর। আতঙ্কে লাফাইয়া পড়ে আহত হইলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দুই শতাধিক নাগরিক নানাবিধ গুরুতর আঘাত লইয়া হাসপাতালে দৌড়াইলেন।
এই ভূমিকম্পটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘এযাবৎকালের মধ্যে সর্বাধিক তীব্র ঝাঁকুনি’ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার। তাহার মতে, এই অঞ্চল ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের অন্তর্গত-যেইখানে চাপ সঞ্চিত হইতেই থাকে এবং সেই চাপ রিলিজ হয় ভূকম্পনের মাধ্যমে। অতএব, আজকের ঘটনা কোনো আকস্মিক ঘটনা নহে, বরং বহুদিন ধরিয়া সঞ্চিত এক শক্তির অবশ্যম্ভাবী উন্মোচন। বাংলাদেশ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ-এই কথা বিশেষজ্ঞেরা বহুদিন ধরিয়া বলিয়া আসিতেছেন।

১৭৬২ সালের ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’-এর রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫। চট্টগ্রাম, ফেনী ও কুমিল্লা পর্যন্ত বিপর্যস্ত করিয়াছিল। ১৮৯৭-এর আসাম ভূমিকম্প ছিল ৮ দশমিক ৭-যাহা সমগ্র পূর্ববঙ্গকে কাঁপাইয়া দিয়াছিল। ১৯১৮ ও ১৯৩০-উভয়ই ৭-এর উপরে মাত্রার ভূমিকম্প-এই ভূখণ্ডকে একাধিকবার বিধ্বস্ত করিয়াছে। ভূ-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বড় ভূমিকম্পগুলি প্রায় ১৫০ বছর পরপর ফিরিয়া আসিবার আশঙ্কা থাকে’-অর্থাৎ ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আবারও ঘটিবার আশঙ্কা রহিয়াছে। আজকের ভূকম্পনটি সেই বৃহত্তর বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বলিয়া মনে করেন কোনো কোনো ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ।
আশঙ্কার কথা হইল-ঢাকা শহরে ২১ লক্ষ ভবন রহিয়াছে। ইহার মধ্যে ৬ লক্ষ ভবন ছয় তলার উপরে এবং এইগুলির একটি বড় অংশে বিল্ডিং কোড মান্য করা হয় নাই। অন্যদিকে, পুরান ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভবন কোডবহির্ভূত। একদিকে টেকটোনিক প্লেট-চাপ সঞ্চিত হইয়া চলিতেছে; অন্যদিকে বহু ভবন দাঁড়াইয়া আছে মৃত্যুফাঁদের মতো। দুই দিকের চাপ একদিন মিলিয়াই যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে, তাহার ইঙ্গিত গতকাল সকালের সেই কয়েক সেকেন্ডে স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। বাংলাদেশে ভবন নির্মাণের নীতি ও বাস্তবতা-এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভয়াবহ ব্যবধান রহিয়াছে।
কেহ যদি খরচ বাঁচাইতে বিল্ডিং কোড না মানিয়া ভবন নির্মাণ করেন-তখন তাহা সর্বক্ষেত্রে অনুধাবন করা সম্ভব নহে। অন্যদিকে, রাজউককে বিশ্বব্যাংক ভূমিকম্প-সহনশীল উন্নয়নে ১৮ কোটি ডলার দিয়া সহায়তা করিয়াছিল-কিন্তু সক্ষমতার অভাব ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এই সহায়তার কার্যকারিতা সম্পন্ন করিতে পারে নাই। অন্যদিকে, এই ভূমিকম্পে বাঁশখালী, বিবিয়ানা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির ইউনিট বন্ধ হইয়া যায়। ইহা একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকনির্দেশ করে-আমাদের অবকাঠামো মধ্যম মানেরও ভূমিকম্প-সহনশীল হইয়া উঠিতে পারে নাই। যেই দেশে একটি মধ্যমাত্রার ভূমিকম্প বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভবন ও জনজীবনকে একই মুহূর্তে বিপর্যস্ত করিয়া দিতে পারে-সেই দেশে প্রকৃত প্রস্তুতি এখনো শুরুই হয় নাই।
রানা প্লাজা ধসের পর গার্মেন্টস ভবনগুলি পরীক্ষা করা হইয়াছিল; বিল্ডিং কোড মান্য ও অমান্যের তালিকা প্রস্তুত হইয়াছিল। তাহার কী হইল? দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও সচেতনতা প্রসার। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল হইতে আতঙ্কে লাফ দিয়া যে শিক্ষার্থীরা গুরুতর আহত হইলেন-ইহা শুধু আতঙ্ক নহে, অজ্ঞতার প্রমাণ। ভূমিকম্প-মুহূর্তে করণীয়-অকরণীয় বিষয়গুলি সর্বজনীন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিখানো আবশ্যক। সারা দেশে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ভূমিকম্প-মহড়া বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।
রিখটার স্কেল ৫-এর উপরের মাত্রা যখন এত ক্ষতি করে, তখন ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে আমাদের পরিস্থিতি কেমন হইতে পারে-সেই অঙ্কটি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বিভাগকে এখনই কষিয়া ফেলিতে হইবে। বস্তুত, আজকের ভূমিকম্প আমাদের সমগ্র জাতিকে একটি নির্মম প্রশ্ন ছুড়িয়া দিল-আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত? না কি ১৭৬২ বা ১৮৯৭-এর পুনরাবৃত্তি ঘটিবার পূর্ব পর্যন্ত আমরা নিষ্ক্রিয় থাকিব? প্রকৃতি সতর্ক করে, কিন্তু প্রস্তুতির দায়িত্ব মানুষেরই।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ