ঢাকার ভোরবেলা আর কুয়াশার নহে-ধুলার ঘন পর্দায় মোড়ানো এক দুঃস্বপ্নের আস্তরণ। যেই শিশুরা মুক্তবায়ুর স্বাদ লইয়া বাড়িয়া উঠিবে, তাহারা আজ সকালবেলা ঘর হইতে পা বাড়ায় মাস্ক বা রুমাল চাপিয়া। শীত একটি অসাধারণ উৎসবময় ঋতু। অথচ এই নগরে শীতের আগমনিবার্তা মানে ঠান্ডা হাওয়া নহে-ধুলার উম্মত্ত বিস্তার, যাহার মাধ্যমে ফুসফুসে নীরব বিষ প্রবেশ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের লাগাতার খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণস্থলের নিয়মনীতিহীন কার্যক্রম, মেয়াদ উত্তীর্ণ যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটার বিষাক্ত নিঃসারণ-সকল মিলিয়া ঢাকা আজ বায়ুদূষণের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে।
একিউআই স্কোর ৩০২ অতিক্রম করিলে যাহা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’-ঢাকার বহু অঞ্চলে তাহা ৩৫০-৪০০ ছাড়াইয়া যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তো স্কোর ৪১২-এমন বায়ু নিঃশ্বাসে নেওয়া মানে ফুসফুসকে খোলা আগুনের মধ্য দিয়া চালাইয়া লইবার মতো।
ইহা কেবল পরিসংখ্যান নহে-ইহা যেন মৃত্যুগ্রাফ। ‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যু হইয়াছে ২ লক্ষ ৩০ হাজারেরও অধিক মানুষের। পাঁচ বৎসরের নিচে শিশুদের মৃত্যুর ৪০ শতাংশই নিম্নশ্বাসনালির সংক্রমণ। আর ইহার জন্য দায়ী বাতাসের অদৃশ্য বিষ। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি শিশুর জীবন নিঃশেষ হইয়া যায়।
অদ্ভুত বৈপরীত্য এই যে-আমরা পানি বিশুদ্ধ করিয়া পান করিবার জন্য ঘরে ঘরে ফিল্টার স্থাপন করি, ফুটাইয়া খাই, জলের নিরাপত্তায় সতর্কতা অবলম্বন করি। কিন্তু যেই অক্সিজেন প্রতিদিন ২০ হাজার বার আমাদের শরীরে অন্তর্গত হয়, যেই বায়ুই জীবনের মূলধারা, তাহা বিশুদ্ধ না হইলেও আমরা বিচলিত হই না। বিশুদ্ধ পানি যেমন জীবনরক্ষাকারী, বিশুদ্ধ বায়ুও তেমনি। বরং পানিকে শিরায় প্রবেশ করিতে সময় লাগে, কিন্তু বাতাস তো প্রতিক্ষণে মস্তিষ্ক, রক্ত ও হৃৎপিণ্ডে প্রবাহিত হইতেছে।
বায়ুদূষণের এই বিপর্যয় যে অনিবার্য ছিল, তাহা নহে। বিশ্বের বহু নগর পূর্বে দূষণে বিপর্যস্ত থাকিলেও, কঠোর নীতি, কঠিন প্রয়োগ, দায়িত্বশীল নগর পরিকল্পনা-ইহাদের সমন্বয়ে রক্ষা করিয়াছে নিজেকে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের টোকিও সত্তর ও আশির দশকে ভয়াবহ বায়ুদূষণের জন্য পরিচিত ছিল। শিল্পাঞ্চল হইতে নির্গত নাইট্রোজেন অক্সাইড এমন পর্যায়ে পৌছাইয়াছিল যে. ছাত্ররা রাস্তার মধ্যে মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া যাইত। কিন্তু সরকার সুনির্দিষ্ট আইন, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, কারখানার আধুনিক প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা, যানবাহনের মান কঠোর করা-এইসকলের মাধ্যমে আজ টোকিওকে বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর নগরীতে পরিণত করিয়াছে। লন্ডন, ১৯৫২ সালের ‘গ্রেট স্মগ’-এর পর যেই দিন বিষাক্ত কুয়াশায় ৪ হাজার মানুষ মারা গেল, সেই দিন হইতেই শহরটি জাগিয়া উঠিল। ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ প্রণয়ন, কয়লাভিত্তিক জ্বালানি বর্জন, গরম করার ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ-এই পদক্ষেপগুলির ফলেই লন্ডন ক্রমে দূষণের কালো অধ্যায় হইতে মুক্ত হইয়াছে। বেইজিং-যেই শহর এক যুগ পূর্বেও আক্ষরিক অর্থেই ধোঁয়াশার নগরী ছিল-আজ অনেকাংশে স্বচ্ছ। সেইখানে সরকারের কঠোর মনোভাব-ইটভাটা ও ভারী শিল্প স্থানান্তর, যানবাহনের নম্বর প্লেট অনুযায়ী চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার-এই সকল উদ্যোগ বায়ুমানকে নাটকীয়ভাবে উন্নত করিয়াছে।
সুতরাং প্রশ্ন জাগে-ঢাকা কি পারে না? কেন এই নগরে নির্মাণস্থলে নিয়মিত পানি ছিটানো হয় না? কেন ইটভাটাগুলি আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরের নির্দেশ থাকিলেও বাস্তবায়িত হয় না?
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়-বাংলাদেশে বায়ুদূষণ এখন ‘ত্রিমাত্রিক সমস্যা’-বায়ু, নীতি ও নগর পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনার ত্রিভুজে আটকাইয়া গিয়াছে পুরা দেশ। মাঝে মাঝে পানির গাড়ি যাইয়া রাস্তা ভিজাইয়া আসে, মাঝে মাঝে কয়েক শত ইটভাটা বন্ধ হয়-কিন্তু ইহা আইসবার্গের শুধু উপরিভাগ সমাধান করিবার মতো। দূষণ কমাইতে হইলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা, কঠোর প্রয়োগ, আর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মনে রাখিতে হইবে, বিশুদ্ধ বায়ু কোনো বিলাসিতা নহে-সুষ্ঠু স্বাভাবিক জীবনধারণের ন্যূনতম পূর্বশর্ত। পানি বিশুদ্ধ করিবার জ্ঞান আমাদের আছে-বায়ু বিশুদ্ধ করিবার প্রয়োজনীয়তা আমরা উপলব্ধি করি না। এই ভুল বোধ যতদিন আমাদের মধ্যে থাকিবে, ততদিন মৃত্যু আমাদের চারিপাশে অদৃশ্য ধুলার আস্তরণে নৃত্য করিতেই থাকিবে।
ধুলার নগরী হইয়া উঠিতেছে নীরব মৃত্যু-উপত্যকা
🕙 প্রকাশিত : ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ৭:০৫ পূর্বাহ্ণ

