সোমবার

১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুই রঙের সুদর্শন ঝিন্টি

দুই রঙের ঝিন্টি ফুলের দেখা পেয়েছিলাম রাজশাহী অঞ্চলে। প্রায় ১৫ বছর আগে সাদা ঝিন্টি দেখেছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তখন বরেন্দ্র এলাকার রুক্ষ মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো স্বর্ণঝিন্টি দেখেছি। পরে অবশ্য অন্যান্য স্থানেও এ ফুল দেখেছি। রকমফের অনুযায়ী এরা জান্তি, ঝুঁটি, কুরুবক বা বন-পাথালি নামেও পরিচিত। একসময় ঢাকায়ও অঢেল ছিল। প্রাকৃতিকভাবেই জন্মাত। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে হলুদ রঙের ফুল দেখা গেলেও সাদা রঙের ফুল অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য। বলধা গার্ডেনের সিবিলিতে নীলচে-বেগুনি এবং ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে হলুদ রঙের ফুল দেখা যায়। সাদা রঙের ফুল আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে। ঝিন্টির লাল রঙের ফুলের নাম কুরুবক। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘কর্ণমূলে কুন্দকলি কুরুবক মাথে।’ অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘কুরুবকের পরত চূড়া/ কালো কেশের মাঝে।’ কুরুবক দেশের কোথাও চোখে পড়েনি।শুভ্রতায় অনন্য সাদা ঝিন্টি
নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সাদা ঝিন্টির (Barleria cristata) প্রধান প্রস্ফুটন মৌসুম। ভারত-পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঝিন্টির বিস্তৃতি লক্ষ করা যায়। গাছের পাতার নির্যাস কাশি ও শরীরের ফোলা কমাতে ব্যবহার্য। ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এ গাছের মূল ও পাতার নির্যাস রক্তস্বল্পতা, কাশি ও প্রদাহ রোগে কাজে লাগায়। উদ্যানসজ্জায় এদের বর্ণবৈচিত্র্য কাজে লাগানো যায়। ইংরেজি নাম Philippine Violet, Crested Philippine Violet.
সাদা ঝিন্টি খাড়া, কাঁটাহীন, প্রায় ১ মিটার উঁচু উপগুল্ম। শাখা রোমশ। গাছ ঝোপালো, অনেকগুলো ডালপালা, কাণ্ড কৌণিক, রোমশ ও সবুজ। পাতা ডিম্ব-লম্বাকৃতি, অখণ্ড, ৪ থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা, ওপরে সবুজ, নিচে হালকা রোমশ, বিন্যাস বিপ্রতীপ। পাতা সরল, প্রতিমুখ, সবৃন্তক, পত্রবৃন্ত ১ থেকে আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা, পত্রফলক উপবৃত্তাকার-দীর্ঘায়ত থেকে বল্লমাকৃতির ও অখণ্ড। ফুল একক বা গুচ্ছবদ্ধ। দলনল ফ্যানেল আকৃতির, দলমণ্ডল প্রায় ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। পুংকেশর ৪টি, অসমান, অবিকশিত পুংকেশরগুলো ৫ মিলিমিটার লম্বা হতে পারে। পরাগধানী দীর্ঘায়ত ও ২ কোষবিশিষ্ট। এদের রেশমি-বাদামি রঙের বীজগুলো গোলাকার।
সোনালি রঙের স্বর্ণঝিন্টি
অগ্রহায়ণের হিমকুয়াশা মাড়িয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঘুরতে ঘুরতে একদিন স্বর্ণঝিন্টি আবিষ্কার করি! রাজশাহী শহর ছাড়িয়ে খানিকটা যেতেই দুই পাশে বিচিত্র শাকসবজির খেত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লাউ-শিমের মাচা, বেগুন, মরিচ, টমেটো, আলু, লালশাক, পালংশাক, কপি, আরও কত–কী! প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো অনেক লতা-গুল্মের মধ্যে কুঁচগাছও চোখে পড়ল। গাছে লাল-কালোয় মেশানো সুদর্শন ফলগুলো উঁকি দিচ্ছিল। বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন স্তরে ভূপ্রকৃতির ব্যতিক্রম নকশায় বিন্যস্ত বিচিত্র ঝোপঝাড়ের ভেতর সেদিন স্বর্ণঝিন্টি খুঁজে পেয়েছিলাম।
স্বর্ণঝিন্টির ইংরেজি নাম Porcupine Flower বা Common yellow bush-violet. পরকুপাইন ফ্লাওয়ার অর্থ শজারু ফুল। সম্ভবত কাঁটাসদৃশ দীর্ঘ স্পাইকের জন্য এমন নামকরণ।
স্বর্ণঝিন্টির বহুমাত্রিক ঔষধি গুণ রয়েছে। সাধারণত জ্বর, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, দাঁতের ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় এ গাছ ব্যবহৃত হয়। দাঁতের ব্যথা উপশম এবং মাড়ির ক্ষত চিকিৎসায় মূলের টিস্যু থেকে তৈরি মাউথওয়াশ ব্যবহার করা হয়। এই অঞ্চলের আদি চিকিৎসায় পুরো উদ্ভিদ, পাতা ও শিকড় বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। পাতা ক্ষত নিরাময়ে, জয়েন্টের ব্যথা কমাতে এবং দাঁতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার্য। অ্যান্টিসেপটিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ত্বক ও মাথার ত্বকের উন্নতির জন্য ভেষজ প্রসাধনী হিসেবে এ উদ্ভিদের নির্যাস কাজে লাগানো হয়।
স্বর্ণঝিন্টি (Barleria prionitis) খাড়া, কাঁটাযুক্ত গুল্ম। সাধারণত একক কাণ্ডযুক্ত, প্রায় দেড় মিটার উঁচু হয়। কাঁটা প্রায় দেড় সেন্টিমিটার লম্বা। পাতা উপবৃত্তাকার, সূক্ষ্ম বিন্দুযুক্ত, রোমশ ঝালরযুক্ত। পাতার কাণ্ড ২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কমলা-হলুদ বা গাঢ় সোনালি রঙের ফুল পাতার অক্ষে জন্মে। মঞ্জরি-ঢাকনা আয়তাকার, ডগায় সূক্ষ্ম বিন্দুযুক্ত। ফুলের নল আড়াই সেন্টিমিটার এবং পাপড়ি ২ সেন্টিমিটার। স্বর্ণঝিন্টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা এবং এশিয়ায় পাওয়া যায়। উদ্যানসজ্জায় এই দুই ফুলের বর্ণবৈচিত্র্য কাজে লাগানো যেতে পারে। সাধারণত বেড়ার ধারেই মানানসই। অপেক্ষাকৃত রুক্ষ অঞ্চলেও বেঁচে থাকতে পারে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ