বৃহস্পতিবার

২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দখল-দূষণে-অস্তিত্ব সংকটে হরিরামপুরের ইছামতি নদী

🕙 প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ

একটা সময় ইছামতিকে বলা হতো নদীর প্রাণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিলো এই নদী। বর্ষা এলেই মাছের প্রাচুর্যে জেলেদের জীবিকা আর কৃষিকাজে প্রাণ ফিরতো ইছামতির তীরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রাণবন্ত নদী আজ রূপ নিয়েছে দূষিত জলাশয়ে। অপরিকল্পিত বাঁধ, দখল আর দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পরেছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ইছামতি নদী।

জানা গেছে, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, ঘিওর, শিবালয়, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার প্রায় ৫০ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইছামতি নদী। পদ্মা ও যমুনার অববাহিকায় শাখা-প্রশাখাগুলো একসময় ছিলো এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। নদীপথেই যাতায়াত আর নিয়মিত নৌকার বহরে যুক্ত সারিবদ্ধভাবে কৃষিপণ্য আদান-প্রদান, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রয়োজন মিটতো এই ইছামতি নদীর বুক দিয়ে।
রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে কাছের জেলা হওয়ায় কিছুদিন আগেও ছিলো ইছামতির সরব উপস্থিতি। কিন্তু এখন দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। নদীর শাখা-প্রশাখায় অপরিকল্পিত বাঁধ, বিভিন্ন জায়গায় প্রভাবশালীদের দখল, অপরিকল্পিত বাধ আর অবৈধভাবে দখলপূর্বক স্থাপনায় বিভিন্ন জায়গায় চিপা খালে পরিণত হওয়ায় পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরকারিভাবে অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্টে আটকে থাকা পানিতে জমেছে কচুরিপানা, ছড়িয়ে পড়ছে পচা দুর্গন্ধ। ছড়াচ্ছে বিভিন্ন রকমের পানিবাহিত রোগ। হরিরামপুরের ইছামতি নদীকে ধীরগতিতে হত্যা করা করা হচ্ছে বলেও অভিমত অনেকের। ইছামতি নদী তীরে অবস্থিত বাড়িঘর থেকে ময়লা আবর্জনার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ইছামতি নদীতে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় তৈরী হচ্ছে আবর্জনার স্তুুপ আর ধ্বংসের খেলায় মেতেছে সাধারণ মানুষ।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামের কুদ্দুস বলেন, মাঝে মাঝে ছোট ছোট প্রকল্প আসে ইছামতি খননের, সেটা দেখা যায় অতিথী পাখির মত। কয়েকদিন পর তাদের আর দেখা যায় না। মরলাম নাকি বাচলাম, আমাদের দিকে তো কেউ ফিরেও তাকায় না। পঁচা দূর্গন্ধ আর জীবানুর মধ্যে আমাদের বসবাস।
দড়িকান্দি গ্রামের কালাম বলেন, আমরা নিয়মিত মশার কামড় আর পঁচা কচুরিপানার দূর্গন্ধে থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন দূর্গন্ধ আর মশার কামড় না খেলে ঘুম আসেনা।

আন্ধারমানিক গ্রামের ফরহাদ বলেন, ইছামতি বাচাতে কে এগিয়ে আসবে। দেশটা শেষ করার জন্য ইছামতিকে মেরে ফেলা হলো প্রথম পদক্ষেপ।
প্রকৃতিপ্রেমী আর সচেতন নাগরিকদের কয়েকজনের সাথে কথা বললে তারা জানিয়েছেন, নদীর তীরে গড়ে উঠেছে হাট-বাজার। সেই বাজারের ময়লা-আবর্জনা পড়ছে সরাসরি ইছামতির বুকে। দূষিত পানিতে বেড়েছে মশা-মাছির উপদ্রব। স্থানীয়দের আশঙ্কা এতে ছড়িয়ে পড়ছে মানববাহিত নানা রোগবালাই। একসময় যে নদীতে নৌকা, ট্রলার, স্টিমারে ছিলো নিয়মিত চলাচল। সেই ইছামতিতে এখন হাঁটু পানিও পাওয়া যায় না অনেক জায়গায়। কোথাও কোথাও শুকনো মরুভূমি। বর্ষায় কৃষি জমিতে পানি প্রবেশে করলেও পানি বের হতে সময় বেশি লাগে, ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যহত হওয়ায় সময়মত ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছেনা। ইছামতি নদীকেন্দ্রিক গ্রামবাংলার ঐতিহ্য—নৌকাবাইচ, সাঁতার প্রতিযোগিতা, মৎস্যের অভয়ারণ্য, সবই এখন স্মৃতির পাতায় বন্দি।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, একটি প্রকল্পের আওতায় বাঁধগুলো অপসারণ করে সেখানে হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার স্থাপনের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে, বাংলার বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে হরিরামপুরের এই ঐতিহ্যবাহী ইছামতি নদীগুলো।

এ বিভাগের আরও সংবাদ

spot_img

সর্বশেষ সংবাদ